ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এবার নির্ধারিত পাঁচ বছর পরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত সময়ে আমরা এর ব্যত্যয় ঘটতে দেখেছি। এখন নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। একসময় ঢাকায় তিনটি সিটি করপোরেশন ছিল। এরশাদ সরকার তিন সিটি করপোরেশনকে একত্রিত করে ঢাকা সিটি করপোরেশন করেছিলেন। ২০১০ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রূপ দেওয়া হয়। এ কারণে দু'জন মেয়র ও দুটি কাউন্সিলর পরিষদ নির্বাচিত হতে যাচ্ছে।

আমরা জানি যে, জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে রাজধানী ঢাকা অনেক বড় একটি শহর। সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ায় কাজগুলো ভাগাভাগি করার সুযোগ হলেও সমন্বয়ের জায়গায় একধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। প্রত্যেক সিটিতে ভোটার সংখ্যা ৩০ লক্ষাধিক করে। ৩০ লাখ ভোটার মানে মোট জনসংখ্যা ৬০ লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ দুই সিটিতে স্থায়ী বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ। এ ছাড়াও প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অগণিত মানুষ এই শহরে প্রবেশ করছে।

গত বছর দুই সিটিতে কিছু নতুন ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আয়তনও বেড়ে গেছে। ঢাকা শহরকে বলা হয় বৃহৎ জনসংখ্যার শহর। সুতরাং মেয়র হিসেবে যারা নির্বাচিত হবেন, তাদের অবশ্যই এই বিশাল জনসংখ্যার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। মানুষের যা যা প্রয়োজন, তা মেটানোর ক্ষেত্রে মেয়রের ভূমিকা থাকতে হবে।

আমাদের মনে রাখা দরকার, শহর হলো বস্তুগত বা স্থানিক বাস্তবতা। মাটি, বৃক্ষ ও জলের সমন্বয়ে গঠিত শহরের উন্নয়ন করতে হবে প্রাকৃতিক পরিবেশকে সমুন্নত রেখে। এর সঙ্গে আসে পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রসঙ্গ। মেয়রকে প্রথমে নগরীর জনসংখ্যা, আয়তন ও সমস্যাগুলো সম্বন্ধে জানতে হবে। একসময় নগরীর সার্বিক উন্নয়ন নগর কর্তৃপক্ষের অধীনে ছিল। ১৯৫৫ সালের দিকে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) নামে একটি পরিকল্পনা সংস্থা গঠন করা হয়, যা বর্তমানে রাজউক নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নগরীর ভৌত ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে পরিকল্পনা করা।

নগরীর ভৌত ও আর্থসামাজিক পরিকল্পনা করার ক্ষমতা মেয়রের নেই। সঙ্গত কারণে তারা নগরীকে সাজানোর পরিকল্পনা করতে পারেন না। তবে মেয়র রাজউককে পরামর্শ দিতে পারেন, সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে পারেন। সামাজিক ক্ষেত্রে মেয়রের অনেক কিছু করার থাকে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষায় মেয়র অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন। পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মেয়রদের কাজ হবে। সব শ্রেণির মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাসের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা রাখতে হবে।

ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট ও পরিবহন। ঢাকার রোড প্ল্যানিং করে রাজউক। ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (ডিইউটিএ) নামেও একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে। এটিও রাজউকের মতো একটি কর্তৃপক্ষ। তাদের দায়িত্ব হলো ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে একধরনের দ্বান্দ্বিকতা বিরাজ করছে। মোটরচালিত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছে ডিইউটিএ, আর মনুষ্যচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে আসছে সিটি করপোরেশন। দুই প্রতিষ্ঠানকেই সমন্বিতভাবে কাজ করা দরকার।

পাশাপাশি মেয়রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে পথচারীর জন্য নিরাপদ ফুটপাত নির্মাণ করা। মানুষকে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে ও আনন্দে হাঁটার সুযোগ দিতে হবে। নিরাপদ ফুটপাতের ক্ষেত্রে হকার একটি বড় ইস্যু। হকারদের প্রতিও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রেখে যত্রতত্র না বসিয়ে তাদের জন্য নির্ধারিত জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।

সমস্যা হলো মেয়ররা হকারমুক্ত ফুটপাত করতে চান, কিন্তু তাদের কোথায় যুক্ত করা হবে, তা চিন্তা করেন না। বর্জ্য অপসারণ ও নগরীর সার্বিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা মেয়রের প্রধান কাজগুলোর একটি। মশা ঢাকার অন্যতম বাস্তবতা। মশা নিধনে দু'ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে; এক. মশা যাতে না জন্মে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দুই. মশা নিধন করা। এজন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। একদিন বা এক সপ্তাহের উদ্যোগে মশা নিধন সম্ভব নয়।

মেয়রদের দূষণ রোধ করে নগরীর পরিবেশ সুস্থ রাখতে হবে। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণ ও দৃষ্টিদূষণ রোধে মেয়রদের কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকার আরেকটি বড় সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা। এই সমস্যা সমাধানে ওয়াসার সঙ্গে মেয়রকে সমন্বয় করতে হবে। এর পাশাপাশি নদী, খাল ও জলাশয়গুলো সংরক্ষণ করা, সচল রাখা এবং দূষণ ও দখলমুক্ত করা মেয়রদের কাজ। মেয়রদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বৃদ্ধিতে শিল্পের বিকাশ ঘটানোর চিন্তা করতে হবে। নগরবাসীর আবাসন চিন্তা সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে। এর পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলা এবং বিনোদনের জন্য মাঠ ও পার্ক নির্মাণ করে মেয়ররা সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পথ সুগম করতে পারেন।

নগর পিতাকে উদ্যোগী হয়ে সিটি করপোরেশনের যে কমিটিগুলো রয়েছে, সেগুলোকে সম্প্রসারণ ও কার্যকর করতে হবে। মেয়রদ্বয় সমাজের নানা ক্ষেত্রে সফল, বিচক্ষণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। তাদের নানা কাজে নেতৃত্বে আনতে হবে। সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা মেয়রের অন্যতম প্রধান কাজ। প্রয়োজনে তিনি আরও দক্ষ জনবল নিয়োগ দেবেন।

আশা করব, মেয়রদ্বয় 'সমন্বয়ের অভাব' কথাটি না বলে নিজেরাই সমন্বয়কের দায়িত্ব নেবেন। তারা নিয়মিত এলাকা পরিদর্শন করে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন। জনসাধারণের সুবিধার জন্য নগরভবনে স্বতন্ত্র তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করবেন। এর পাশাপাশি মেয়রদের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর অফিস স্থাপনের মাধ্যমে কাউন্সিলরদেরও প্রত্যক্ষ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতে হবে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দুই দলের চার প্রার্থীই যথেষ্ট মেধাবী, শিক্ষিত, পরীক্ষিত ও নিজ ক্ষেত্রে সফল। আমরা খুবই আশাবাদী, যে দু'জনই নির্বাচিত হোক না কেন- তারা সমৃদ্ধ ও সুস্থ নগরী গড়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।