ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি প্রসিদ্ধ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের জানাজা নামাজে শনিবার লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণ বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কোনো বিবেচনাতেই অবিমৃষ্যকারিতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে যেখানে ঘরের বাইরে দু'জনও একত্র হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে; জরুরি প্রয়োজনে যেখানে কয়েক ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে; যেখানে রাস্তাঘাট, বাজার-বন্দরে জনসমাগম রুখতে রীতিমতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে; সেখানে এত মানুষ কেবল জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য ভিড় করা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জানাজা নামাজে বিপুল লোক সমাগম আমাদের দেশে নজিরবিহীন নয়। প্রয়াত অধ্যক্ষও ওই অঞ্চলের একশ্রেণির মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় ছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমার নামাজের জামাত সীমিত পরিসরে পড়া হচ্ছে, সেখানে জানাজায় এমন সমাগম কি জরুরি ছিল? আমরা জানি, ইসলাম ধর্মমতে মৃতের জানাজা সামাজিক কর্তব্য, ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের জন্য অবশ্য কর্তব্য নয়। সমাজের কিছু মানুষ অংশ নিলেও ধর্মীয় বিধান প্রতিপালন হতে পারে। অথচ এমন একটি কর্তব্য একটি জনপদের অধিকাংশ মানুষ একযোগে পালন করতে গিয়ে আরও বিপুল মানুষের করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করল মাত্র।
বস্তুত এটা ভুলে যাওয়া চলবে না যে, প্রতিবেশী ভারতে এমনই একটি ধর্মীয় সমাবেশ থেকে বিভিন্ন এলাকায় করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ভাইরাসে আক্রান্ত দেশগুলোর শীর্ষ সারিতে থাকা ইতালিতেও পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করেছিল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে। ওই দুই অঘটন নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত সমালোচনা ও সতর্কতা বার্তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আমরা ভাবতে পারিনি। এখন যদি এর মাধ্যমে জানাজায় অংশগ্রহণকারী ছাড়াও তাদের সংস্পর্শে আসা আরও কয়েক লাখ মানুষের মধ্যে করোনা ছড়ায়, তার দায় কে বা কারা নেবে? আমরা মনে করি, এই অবিমৃষ্যকারিতা নিঃসন্দেহে বহুপক্ষীয় ব্যর্থতার ফসল।
আমরা মনে করি, স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন এক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ওই অঞ্চলের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা, অতীতের কিছু আলোচিত ঘটনা বিবেচনা করে প্রশাসনের উচিত ছিল শুক্রবার আলোচ্য ধর্মীয় নেতার প্রয়াণের পরপরই জানাজা নামাজ সীমিত পরিসরে পড়ার ব্যাপারে তার পরিবার ও সহকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। যেখানে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় মসজিদে জামাত সীমিত করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে এই জানাজার ব্যাপারে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। প্রয়াত অধ্যক্ষ ও ইসলামী রাজনীতিকের সহযোদ্ধা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি। যুক্তি, প্রজ্ঞা, ও দূরদর্শিতার পরিবর্তে তারা স্পষ্টতই প্রাধান্য দিয়েছে ভাবাবেগ। সামষ্টিক কল্যাণের সুমহান চিন্তার বদলে তারা গোষ্ঠীগত সুবিধার সংকীর্ণ পথে হেঁটেছেন। যেসব মানুষ নানাভাবে এসে এই জানাজায় অংশ নিয়েছেন, তাদের জন্যও যেমন করুণা, তেমনই বেদনা অনুভব করি আমরা। তাদের আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়েও বলা যায়- এত আলোচনা, সতর্কতা, এমনকি শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সাবধানতা কি তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি?
করোনাভাইরাস বিস্তার ও সংক্রমণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব 'ড্যামেজ কন্ট্রোল' করার দিকে নজর দিতে হবে। আমরা দেখছি, শনিবার সকালে আলোচ্য ওই জনসমাগম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গঠিত হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটি। আমরা দেখতে চাইব, দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী প্রত্যেককে জবাবদিহি করা হয়েছে। ওই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও বিনা খেসারতে পার পেতে পারে না। কিন্তু সবকিছুর আগে জানাজায় অংশ নেওয়া প্রত্যেকের 'কোয়ারেন্টাইন' বা সঙ্গনিরোধ নিশ্চিত করতে হবে। ভালো হতো তারা যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ ব্যবস্থায় যেতেন অথবা তাদের প্রত্যেকের পরিচিতি শনাক্ত করা যেত। সেটা যেহেতু সম্ভব নয়, অংশগ্রহণকারীদের এলাকা ধরে ধরে ইতোমধ্যে সূচিত লকডাউন সর্বাত্মক সফল করতেই হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি ওই জেলার সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। এমনকি বিলম্বিত বোধোদয়ের স্মারক হিসেবে এগিয়ে আসতে পারে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। আমরা বিশ্বাস করি, সব পক্ষ সক্রিয় হলে তা কঠিন হতে পারে না। তা করতে হবে বহু মনীষীর স্মৃতিধন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই। করোনাভাইরাসের মতো বৈশ্বিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে দেশের অন্যত্রও এ ধরনের অঘটনের পুনরাবৃত্তি রোধের বিকল্প নেই।