করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারকে জোরালো ধাক্কা দিয়ে যে নড়বড়ে অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে, ইতিহাসে এমনটা আগে দেখা যায়নি। তেল নিয়ে রাজনীতির জটিল খেলায় জড়িয়ে যায় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। এই খেলার মূল দুই খেলোয়াড় ছিল রাশিয়া ও সৌদি আরব- বিশ্বের দুই তেল সম্রাট। উৎপাদন অব্যাহত রেখে একদিকে রাশিয়া চেষ্টা করেছে বাজার দখলে রাখতে। অন্যদিকে সৌদি আরব চেয়েছে উৎপাদন কমিয়ে মূল্য ধরে রাখতে। কিন্তু রাশিয়া শুরুর দিকে সৌদি আরবের এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক পর্যায়ে সৌদি আরবও উৎপাদন বাড়িয়ে তেলের দাম আরও কমিয়ে বাজার দখলে রাখার চেষ্টা শুরু করে। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছে তেলের বাজার সৌদি নেতৃত্বের গ্রুপ থেকে বের করে দখলে নিতে। করোনা সংকটের মুহূর্তে রাশিয়া সুযোগ নিতে চেয়েছিল। ওপেক প্লাসকে সঙ্গে নিয়ে রাশিয়া বিশ্ব তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। যদিও এনার্জি এটলাসের হিসাব অনুসারে রাশিয়া আবিস্কৃত তেলের মজুদের দিক থেকে বিশ্বে আট নম্বরে অবস্থান করছে। শীর্ষে আছে ভেনেজুয়েলা। তবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদনে শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব দ্বিতীয় অবস্থানে। আর তৃতীয় স্থানে আছে রাশিয়া। রাশিয়ার দখলের অভিপ্রায় করোনাকালে তেলের বাজারকে নড়বড়ে করে দেয়। বিশেষ করে করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে জনগণকে রক্ষা করতে পৃথিবীর প্রায় ৩০০ কোটি মানুষকে কোনো না কোনো ধরনের লকডাউনের মধ্যে রাখা হয়েছে। যার দরুন বন্ধ হয়ে যায় কলকারখানা, গণপরিবহন, আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল। এর প্রভাবে হঠাৎ বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা কমে গেছে ব্যাপক। এতে করে বিপাকে পড়ে গিয়েছে তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো।
এ অবস্থায় বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাবের ধাক্কায় তলানিতে চলে যাওয়া চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তেলের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়াটাই হতো স্বাভাবিক ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে উৎপাদন কমানোর জন্য দরকার ছিল বড় বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও সমঝোতা। তাই তেলের বাজারের বড় খেলোয়াড় সৌদি আরব অন্য বড় খেলোয়াড় রাশিয়াকে প্রস্তাব দিল, চলো আমরা তেলের উৎপাদন বেশ খানিকটা কমিয়ে ফেলি। কিন্তু রাশিয়া সেই প্রস্তাবে বিন্দুমাত্র সাড়া দেয়নি। এতে সৌদিরা কিছুটা ক্ষেপে গিয়ে তেলের উৎপাদন আরও বাড়িয়ে দিয়ে আগের চেয়েও কম দামে বিক্রি শুরু করল। নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখানোর চেষ্টা করল। রাশিয়াও ছেড়ে কথা বলার খেলোয়াড় না। তারা এবার সৌদিদের থেকেও কম দামে তেল বিক্রি শুরু করল। এতে শুরু হয়ে গেল দুই রাঘববোয়ালের তেলের মূল্য নিয়ে খেলা- কে কার চেয়ে কত কমে তেল বিক্রি করতে পারে। কেউ কাউকে কোনো ছাড় দিল না। ফলাফল হিসাবে বিশ্বব্যাপী প্রতি ব্যারেল তেলের দাম পড়তে পড়তে ২২ দশমিক ৫৮ ডলারে গিয়ে ঠেকে, যা হচ্ছে ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছর যার দাম ছিল গড়ে ৫৮ দশমিক ৫ ডলার। তেলের এই ঐতিহাসিক দরপতন ভোক্তাদের (পরিবহন, বিমান, কলকারখানা) জন্য সুখবর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তেল কিনে এখন ব্যবহার করবে কারা? পরিবহন খাত, বিমান, কলকারখানা সবই তো করোনায় আটকা পড়ে ব্যবসা বন্ধ করে বসে আছে। অন্যদিকে কম দামের সুযোগে বিভিন্ন দেশ কিছুদিনের মধ্যেই তাদের তেলের মজুদ পরিপূর্ণ করে ফেলেছে। তাদের সব বাঙ্কার এখন তেলে টইটুম্বুর আর তেল রাখার জায়গা নেই। তাই এই কম দামেও এই মুহূর্তে ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যার দরুন তেলের উৎপাদন না কমালে দাম তো আর বাড়বেই না বরং আরও কমতে পারে।
তেল নিয়ে বাণিজ্যের নামে এক ধরনের খেলায় বড় ধরনের লোকসান হলেও রাশিয়া ও সৌদি আরব উভয়ই দাবি করছে, তারা এই লোকসান হজম করতে সক্ষম, কারণ তাদের উভয়েরই নাকি প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ আছে। কিন্তু এই খেলার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন ছোট তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যারা সরাসরি তেল বিক্রির অর্থের ওপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল। বর্তমানের কম দামে (২৫ ডলার) তেল বিক্রি করায়, প্রতিদিন পৃথিবীর প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল নিজেদের উৎপাদন খরচ উঠিয়ে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার দরুন উৎপাদনকারীরা পড়ছে মারাত্মক লোকসানের মুখে। এতে করে ছোট উৎপাদনকারী দেশগুলো ক্ষতি পোষাতে না পেরে তেল উৎপাদন একেবারে বন্ধ করে দিতে একরকম বাধ্য হবে বা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার মতে, ইরাক, নাইজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, আলজেরিয়ার মতো বহু গরিব দেশ এ বছর তাদের কামাইয়ের ৮৫ শতাংশ হারাতে পারে। এমনিতেই এই দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থা দুর্বল। তার ওপর তেল থেকে কামাই বন্ধ হয়ে গেলে তারা দেশের বিভিন্ন খাতের কর্মচারীদের বেতন দেবে কীভাবে, সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়। বৈশ্বিক দুর্যোগের এই অসময়ে, ছোট দেশের স্বার্থে উৎপাদন কমিয়ে দাম বাড়ানোর কথা চিন্তা করা উচিত ছিল। অথচ তাদের বাজার থেকে সরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে এই সুযোগে বৈশ্বিক তেলের বাজারে আরও বড় দখল নিতে চায় রাশিয়া আর সৌদি আরব। এটাই লোকসান হজম করে কম দামে তেল বিক্রির কারণ। এটাই সম্ভবত তাদের খেলার মূল লক্ষ্য।
শুধু যে ছোট দেশ এই খেলার শিকার তা কিন্তু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিও রেহাই পাচ্ছে না লোকসানের হাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের ছোট ছোট অনেক তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে দেউলিয়া করাও কিন্তু এই খেলার অন্যতম একটা কারণ হতেই পারে। কারণ ব্যাপক লোকসানের মুখে বেসরকারি সেসব কোম্পানিগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। তাই হয়তো সৌদি ও রাশিয়ানদের দিকে ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি- উৎপাদন কমাও দাম বাড়াও। নয়তো অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা আসবে। অবশেষে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ এপ্রিল সৌদি আরবের সভাপতিত্বে জি-২০ দেশের জ্বালানি মন্ত্রীরা জরুরি এক অনলাইন বৈঠকে বসে এবং এতে 'অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) ও এর মিত্ররা' দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে মে ও জুন মাস থেকে বৈশ্বিক তেল উৎপাদন প্রতিদিন ১ কোটি ব্যারেলে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়, যা বিশ্বের বর্তমান মোট সরবরাহের ১০ শতাংশ। আশা করা হচ্ছে, অন্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো দিনে পাঁচ লাখ ব্যারেল তেলের উৎপাদন কমাবে। নিঃসন্দেহে এটি তেল উৎপাদনকারী সব দেশ এবং কোম্পানিগুলোর জন্য সুসংবাদ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, পৃথিবীকে স্তব্ধ করা মহামারিও যেখানে বন্ধ করতে পারল না তেলের বাজার কব্জা করার এই খেলা, সেখানে কি সব দেশ শেষ পর্যন্ত তেলের উৎপাদন সত্যিই এতটা কমাবে? নাকি ভবিষ্যতে আবার শুরু হতে পারে এই খেলার আরেকটি ইনিংস? সময়ই এর উত্তর দেবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক গবেষক
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থা (আইরিনা), জার্মানি