বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাবমতে, ১৯৭৬ থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট এক কোটি ৩০ লাখ ২৮ হাজার ৪১০ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গমন করেছেন। এই বিশাল অভিবাসীদের ঠিক কত অংশ এই মুহূর্তে বিদেশের মাটিতে কর্মরত আছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া বেশ দুরূহ ব্যাপার। তাদের অনেকেই হয়তো স্বল্পমেয়াদি কর্মভিসা নিয়ে বিদেশ গমন করেছেন। তবে সেই সংখ্যা যাই হোক না কেন, এই জনশক্তি প্রেরিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ-পূর্ব বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে এই প্রেরিত অর্থ ছিল আমাদের অর্থনীতির একটি উলেল্গখযোগ্য একটি ইতিবাচক দিক। কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সেই বিশেষ খাতটির অবদান যে আগের মতো আর থাকবে না, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
বাংলাদেশের মোট জনশক্তি রপ্তানির একটি বিশাল অংশই মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশে হয়ে থাকে। সারাবিশ্বের মতো এই দেশগুলোতেও অর্থনৈতিক মন্দাভাব এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাই করোনাভাইরাস-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে বাংলাদেশি অভিবাসীরা এসব দেশে বেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, সেটা এখন অনেকটাই পরিস্কার। এই ঝুঁকি শুধু আমাদের অর্থনীতিতে বৈদেশিক আয় কমিয়ে দেবে সেটাই নয়, বিদেশফেরত হাজারো শ্রমিক হঠাৎ করে দেশে এসে কর্মহীন হয়ে যেতে পারেন, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি দেশ থেকে যাচাই-বাছাইসাপেক্ষে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার একটি বিশেষ উদ্যোগ সরকার হাতে নিয়েছে, যা মানবিক ও সময়োপযোগী। বিদেশে অবস্থানরত অনেক অভিবাসীই হয়তো অর্থনৈতিক মন্দাজনিত কারণে তাদের চাকরি হারাতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে দেশকে একদিকে যেমন বর্তমানে বিদেশে কর্মরত অনেক অভিবাসীকে পুনঃগ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে, ঠিক তেমনি প্রতিবছর যে পরিমাণে বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ বিভুঁইয়ে পরিগমন করে থাকেন, সেই সংখ্যাতেও একটি বড় ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে চাই একটি সময়োপযোগী ও সঠিক পরিকল্পনা। মনে রাখতে হবে, এই পরিস্থিতির শিকার শুধু বাংলাদেশ একা নয়, সারাবিশ্বের লাখ লাখ অদক্ষ এবং স্বল্প দক্ষ শ্রমিক থেকে শুরু করে উচ্চ পেশাগত যোগ্যতাসম্পন্ন অনেকেই শ্রমবাজারে নিজেদের উদ্বৃত্ত শ্রমিকের তালিকায় দেখতে পেতে পারেন।
সর্বপ্রথম বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে যে যে দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীরা সাময়িক কিংবা স্থায়ীভাবে অভিবাসন সুবিধা হারাতে পারেন, সেখানের সরকারের সঙ্গে দক্ষভাবে দেনদরবার করে আসন্ন এই বিপরীত গতিকে যতটুকু প্রশমন করার চেষ্টা করা। মনে রাখতে হবে, অভিবাসীদের পাঠানো আয় বাংলাদেশ অর্থনীতির একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এবং আগামী দিনগুলোতেও এই আয়ের সহজ বিকল্প পাওয়া বেশ কঠিন হবে। তাই এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
বিদেশফেরত অভিবাসীদের একটি বিস্তারিত তথ্যপুঞ্জি তৈরি করা উচিত, যেখানে আগত ব্যক্তিরা কোন দেশ থেকে ফেরত আসছেন, কতদিন থেকে বিদেশে ছিলেন এবং কোথায় কোথায় কাজ করেছেন, সেখানে কী ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের শিক্ষাগত ও দক্ষতার বিস্তারিত তথ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ফেরত এসে কী ধরনের কাজের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে পারেন- তার একটি বিস্তারিত তথ্যপুঞ্জি তৈরি করা দরকার। এই তথ্যভাণ্ডার-পরবর্তীকালে বিদেশফেরত শ্রমিকদের পুনঃঅভিবাসনে সহায়তাকরণে কিংবা দেশে কোন ধরনের পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিদেশফেরত অভিবাসীদের পুনর্বাসনে সরকার দুই ধরনের উদ্যোগ হাতে নিতে পারে। প্রথমত, যেসব অভিবাসী স্বল্প সময়ের মধ্যে (এ ক্ষেত্রে সময়ের একটা মাপকাঠি নির্ধারণ করা যেতে পারে) বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনঃঅভিবাসনের সুযোগ দেওয়া। সেসব ক্ষেত্রে পুনঃঅভিবাসন-প্রত্যাশীকে সুযোগমতো দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। অন্যদিকে, যেসব বিদেশফেরত বাংলাদেশি অনেক বছর ধরে বিদেশে অবস্থান করেছেন এবং নতুন করে তাদের পুনঃঅভিবাসনের সুযোগ কম, তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিচারে বিশেষ ঋণ সুবিধা দিয়ে উদ্যোক্তা বানাতে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সরকারকে বিদেশফেরত অভিবাসীদের পুনর্বাসনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
বাংলাদেশি দক্ষ জনশক্তির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিকল্পে সরকারের একটি বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। যেমন- প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষক, ডাক্তার, নার্স, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভারতীয় উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল, এমনকি স্বল্পোন্নত দেশে চাকরির জন্য যাচ্ছেন। আফ্রিকা মহাদেশের ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, কেনিয়া, মিসর, মরক্কো, ঘানা, গেবনসহ নানা দেশে প্রতিবছর হাজারো ভারতীয় চাকরি নিয়ে যান। উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশ এই দেশসহ অন্যান্য দেশে অনেক সহজেই দক্ষ শ্রমিকদের জন্য একটি বাজার তৈরি করতে পারেন। ঠিক একইভাবে উন্নত দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে দেশের অভ্যন্তরে সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

সহযোগী অধ্যাপক এবং সমন্বয়ক, পরিবেশ অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস