করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে শিশুদের অন্যান্য রোগের টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না- শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের এই তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা জানি, করোনাভাইরাস যে এভাবে সর্বব্যাপ্ত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে, তার কারণ এখনও এর প্রতিষেধক টিকা আবিস্কৃত না হওয়া। একই সঙ্গে মনে রাখা জরুরি, এখন যে ছয়টি রোগের টিকা শিশুদের দেওয়া হয়ে থাকে, সেগুলোও করোনার মতোই বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে করোনার চেয়েও বেশি মারাত্মক। এখন এক ভাইরাস থেকে বাঁচতে গিয়ে অনেক ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করা হচ্ছে? আমরা মনে করি, করোনাভাইরাস সতর্কতার মধ্যেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষর অন্যান্য রক্ষকবচগুলো অবহেলায় ফেলে রাখা যাবে না। তাতে করে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়তে পারে, অন্যদিকে করোনা মোকাবিলার লড়াইও হয়ে উঠতে পারে আরও কঠিন। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে অর্জিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা আমরা এভাবে করোনার স্রোতে ভেসে যেতে দিতে পারি না।

আমরা অস্বীকার করছি না যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন। একদিকে যেমন অভিভাবকরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না, অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের পক্ষে এখন বাড়ি বাড়ি দিয়ে টিকা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। দেশের বেশিরভাগ এলাকা লকডাউন থাকায় যাতায়াতও সহজ নয়। যে কারণে মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে হাম-রুবেলা প্রতিরোধে যে এমআর টিকা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। এটাও স্বীকার করতে হবে, এই পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশের নয়। বিশ্বের আরও অনেক দেশেই শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত রাখতে হয়েছে। বিশেষত এই সময়েই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল হামে টিকাদান কর্মসূচি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এ কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১২ কোটি শিশু হামের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমাদের মনে আছে, গত মাসের গোড়ার দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি জনপদে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল এবং প্রাণহানি ঘটেছিল কয়েকজন শিশুর। ওই অঞ্চলে আগে থেকেই টিকাদান কর্মসূচি শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না বলে এমন মর্মান্তিক চিত্র। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও শিশুদের টিকাদান ব্যাহত হওয়ার ফল হবে আরও ভয়ংকর। মনে রাখতে হবে, সচ্ছল ও বিত্তবানরা যে কোনোভাবেই হোক, টিকা নিতে পারবে। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই আমরা দেখছি যে, রাজধানীতে বেসরকারি হাসাপাতাল ও ক্লিনিকে যাচ্ছেন বিত্তবানরা। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যেতে পারছেন সংশ্নিষ্ট সদরের বাসিন্দারা। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু ও অভিভাবকরা সবচেয়ে বিপাকে। এই বিপাক দূর করতেই হবে।

যক্ষা, পোলিও, ধনুষ্টঙ্কার, হাম, হুপিংকাশিসহ বিভিন্ন রোগে বাংলাদেশে একসময় কত শিশু প্রাণ হারাত আমরা ভুলে যাইনি। এসব রোগের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক কর্মসূচি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সত্তর দশকের শেষ দিকে যখন বাংলাদেশও বাস্তবায়ন শুরু হয়, তখন মাত্র দুই শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। ক্রমে ক্রমে যেমন টিকার আওতায় আরও নানা রোগ এসেছে, শিশু ছাড়াও মা ও প্রসূতিরা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তেমনই উৎসাহব্যঞ্জক হারে বেড়েছে টিকাদান কর্মসূচির আওতা ও এখতিয়ার। এখন অন্তত ৮২ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেছে। শুধু তাই নয়, পোলিওর মতো রোগ বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা গেছে। এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য রোলমডেল। আমাদের মনে আছে, টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাপক সাফল্যের কারণে গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিকভাবে 'ভ্যাকসিন হিরো' পুরস্কার পেয়েছেন। তারও আগে শিশু ও মাতৃমৃত্যু রোধে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ পেয়েছে জাতিসংঘ পুরস্কার। এত সাফল্য করোনাভাইরাসের কাছে কি হেরে যেতে দিতে পারি আমরা? বিষয়টি যে নিছক হার-জিতের নয়, বরং দেশের কোটি কোটি শিশু তথা ভবিষ্যৎ নাগরিকের জীবন হুমকিতে ফেলা, আমরা কীভাবে ভুলে যেতে পারি?

আমরা দেখতে চাই, যে কোনো মূল্যেই শিশুর টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই সরবরাহ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পাঠানো যেতে পারে। ঘরে ঘরে যাওয়া হয়তো সম্ভব নয়, মানতেই হবে। কিন্তু ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সামাজিক দূরত্ব মেনেই টিকা দেওয়া যেতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, অভিভাবকরা আগের তুলনায় সচেতন। স্বাস্থ্য বিভাগ সক্রিয় হলে করোনাকালের দুঃসময়েও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখা যাবে। বিষয়টি কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।

বিষয় : শিশুর টিকাদান

মন্তব্য করুন