দেশব্যাপী কার্যত 'লকডাউন' চলা সত্ত্বেও সীমিত পরিসরে বিপণিবিতান বা শপিংমলগুলো খুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত অস্বাভাবিক নয়। এই সিদ্ধান্ত কতটা সঙ্গত হয়েছে, সামনের দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। আমরা এখনই বলতে চাই- কেনাবেচার ক্ষেত্রে শারীরিক দূরত্ব যেন নিশ্চিত করা হয়। অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, করোনা সংক্রমণে বাংলাদেশ এখন 'চূড়ায়' রয়েছে। বস্তুত নমুনা পরীক্ষা করা মানুষের মধ্যে প্রতিদিন সংক্রমণের হার বৃদ্ধিও তা সমর্থন করে। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরের সামাজিক মেলামেশায় সর্বোচ্চ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিকল্প নেই। আমরা প্রত্যাশা করব, বিক্রেতা ও ক্রেতারা এই বাস্তবতা অনুধাবন করবেন এবং ভেবেচিন্তে কেনাবেচা করবেন।
স্বীকার করতে হবে- কভিড-১৯ আক্রান্ত বিশ্বে দুই ধরনের উদাহরণই রয়েছে। একদিকে কোনো কোনো দেশ লকডাউন প্রলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আবার কোনো কোনো দেশ সীমিত পরিসরে দোকানপাট, অফিস-আদালত খোলা শুরু করেছে। দুই পক্ষেই যুক্তি কম নেই। একদিকে যেমন করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই এখন পর্যন্ত সর্বোত্তম পন্থা, অন্যদিকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার পরিণাম হতে পারে করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়ংকর। বিশেষত নিম্নবিত্ত শ্রেণির জন্য এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সবচেয়ে কঠিন। ইতোমধ্যেই খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে নৈরাশ্যজনক যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা নৈরাজ্যে রূপান্তরের আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না।
এও অস্বীকার করা যাবে না, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকবিলায় সরকার প্রথম থেকেই ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। কিন্তু এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ত্রাণ কার্যক্রম 'আপৎকালীন' ব্যবস্থা মাত্র। ত্রাণসামগ্রী দিয়ে একটি পরিবারের কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে, অনির্দিষ্টকাল নয়। এ ছাড়া যারা ত্রাণ দিচ্ছেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে তাদের সামর্থ্যও এক সময়ে সীমিত হতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের সরকারের সামর্থ্যও অপরিসীম নয়। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশের দক্ষতা ও সামর্থ্য বিশ্বখ্যাত সন্দেহ নেই, কিন্তু সেসব দুর্যোগ সীমিত সময়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক। বন্যায় যদিও কখনও কখনও সারাদেশ আক্রান্ত হয়, তা পর্যায়ক্রমে। করোনাভাইরাসের মতো একযোগে দেশ কেবল নয়, বিশ্বকেও আক্রান্তকারী দুর্যোগ আগে কখনও আমরা মোকাবিলা করিনি। দুর্যোগের কারণে এভাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশ বা বিশ্বের নেই।
আমরা দেখছি, বাংলাদেশ সরকার সীমিত পরিসরে দোকানপাট খোলার অনুমতি দিয়েছে শর্তসাপেক্ষে। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত খেলা থাকবে। ক্রেতাদের যেমন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ঢুকতে হবে, তেমনই বিক্রেতাদেরও নিতে হবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। আমরা মনে করি, সাংস্কৃতিক অভ্যাস বিবেচনায় এমন সতর্কতা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার স্বার্থেই এই কঠিন কাজটি আয়ত্ত করতেই হবে আমাদের। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নিত্যপ্রয়োজন মেটানোর জন্যও এর বিকল্প নেই। বস্তুত যেমন ক্রেতা, তেমনই বিক্রেতাদের সদিচ্ছা ও সক্রিয়তাই পারে এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে। আমরা সেটাই দেখতে চাই। একই সঙ্গে দশটা-চারটা বিপণিবিতান খোলার সময়সূচি নিয়েও সংশ্নিষ্টদের ভাবতে বলি। কারণ সময় যত সীমিত হবে, ভিড় বৃদ্ধির ঝুঁকি তত বাড়বে। ততই বাড়বে সংক্রমণের শঙ্কা। অবশ্য গণপরিবহন এখনও বন্ধ রাখায় এবং এবারের ঈদযাত্রা বাতিল করায় আন্তঃঅঞ্চল জনচলাচল বন্ধ থাকবে। বিপণিবিতানগুলো খোলা রাখার ক্ষেত্রেও এভাবে অঞ্চল ভাগ করে দেওয়া যায় না? রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে এক একটি অঞ্চল অবরুদ্ধ করে সেখানকার বিপণিবিতান যদি শুধু ওই অঞ্চলের জন্যই খোলা রাখা যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে আশা করা যায়। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে, পরিস্থিতির অবনতি হলে সঙ্গে সঙ্গে এই সীমিত বেচাকেনার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি রাখা।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু একই সঙ্গে করোনার প্রাণঘাতী ক্ষমতাও বিবেচনা করতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা। কেবল সতর্কতাই পারে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছেও আমরা সেই দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করি।