ভার্চুয়াল আদালত

ই-বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো 'ভার্চুয়াল আদালত' পরিচালনার যে উদ্যোগ বিচার বিভাগ গ্রহণ করেছে, আমরা সেটাকে স্বাগত জানাই। বস্তুত এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো একটি মাইলফলক। নাগরিকরাও নতুন এই ব্যবস্থাকে কীভাবে স্বাগত জানিয়েছে, তার ছাপ দেখা গেছে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আমরা জানি, বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও আগে থেকেই প্রচলিত। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা একাধিকবার এ ব্যাপারে ইতিবাচক অভিমত ব্যক্ত করেছি। আমরা আনন্দিত যে, বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের বিচার বিভাগ প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারে উদ্যোগী হয়েছে। গত মঙ্গলবার উচ্চ আদালতে ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল শুনানির প্রথম দিন হালদা নদীর ডলফিন সুরক্ষা সংক্রান্ত আদেশ দিতে গিয়ে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান যথার্থই বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে দেশে 'ই-জুডিশিয়ারি' প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ সম্পন্ন হলো। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী দিনগুলোতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণেও সংশ্নিষ্টরা উদ্যোগী হবেন। একটি গতিশীল ও অশংগ্রহণমূলক বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এর বিকল্পও নেই।

অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশে ভার্চুয়াল বিচার প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে; কিন্তু এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বহুল আকাঙ্ক্ষিত। এর প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে উচ্চ ও নিম্ন আদালতের কার্যক্রম যেভাবে একযোগে স্থগিত হয়ে গিয়েছিল, তা ছিল প্রায় নজিরবিহীন। আবার প্রাণঘাতী এই ভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে এর বিকল্পও ছিল না। আমরা দেখেছি, পরিস্থিতি উত্তরণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই সীমিত পর্যায়ে আদালতের কার্যক্রম শুরুর একটি উদ্যোগ প্রধান বিচারপতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন মহলের অনুৎসাহে তা একদিনের মধ্যেই স্থগিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গৃহীত হয় শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থেকে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীর ডিজিটাল উপস্থিতির মাধ্যমে শুনানির ধারণা। আমরা স্বস্তির সঙ্গে দেখেছি- স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই 'আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০' মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়েছিল। আমরা মনে করি, এর মধ্য দিয়ে আসলে যেকোনো মূল্যে বিচার কাজ অব্যাহত রাখতে বিচার ও নির্বাহী বিভাগের প্রত্যয়ই স্পষ্ট হয়েছে।

আমরা দেখেছি, প্রথমদিকে আইনজীবীদের একটি অংশ নতুন ব্যবস্থার প্রতি বিরূপ অবস্থান গ্রহণ করেছিল। এমনকি জেলা পর্যায়ে কোথাও কোথাও ঘোষিত হয়েছিল আদালত বর্জনের মতো কর্মসূচি। প্রযুক্তির প্রতি বেশিরভাগ আইনজীবীর অমূলক ভীতি থেকেই এমন অবস্থান ছিল, সন্দেহ নেই। স্বস্তির বিষয়, ইতোমধ্যে তারা সেই ভীতি কাটিয়ে উঠেছেন এবং ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। অবশ্য নতুন প্রজন্মের আইনজীবীরা প্রথম থেকেই উৎসাহ দেখিয়ে আসছেন। এক্ষেত্রে আইনজীবী, আদালতের কর্মচারী এমনকি কোনো কোনো বিচারকেরও প্রযুক্তি ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। আমরা জানি, ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতের তরফে বিচার প্রক্রিয়ায় জড়িতদের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে এবং এই কার্যক্রম সম্প্রসারিত হতে থাকলে অনভ্যস্ততা কেটে যেতে সময় লাগবে না। শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও দেখা যাচ্ছে, ভার্চুয়াল আদালতের প্রতি আইনজীবীদের আগ্রহ বাড়ছে। আমরা মনে করি, বাদী, বিবাদী ও সাক্ষীদেরও যদি ভার্চুয়াল আদালত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তা আদালতের কাজ সহজ করবে।

স্বীকার করতে হবে, ভার্চুয়াল আদালত এখনও আনুষ্ঠানিকতা। অধিকাংশ আদালতে শুধু জামিন শুনানি সম্পন্ন হচ্ছে। আমরা দেখতে চাইব, সব ধরনের শুনানিই গৃহীত হবে শারীরিক অনুপস্থিতি মেনে। এতে করে বিচারপ্রার্থীর পছন্দমতো আইনজীবীকে বিচারিক আদালতে 'উপস্থিত' করাও সহজ হবে। নতুন এ ব্যবস্থা চালুর পররবর্তী চার দিনে তিন হাজার আসামির জামিন দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের এমন কার্যক্রম সেদিক থেকে মানবাধিকার সুরক্ষায়ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা জানি, এখনও ভাচুর্য়াল রেকর্ড গ্রহণের ব্যবস্থা চালু হয়নি। বিষয়টি সহজও নয়, মানতে হবে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে ওই ব্যবস্থায় যেতেই হবে। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক যথার্থই বলেছেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টকে উদ্যোগী হতে হবে সর্বাগ্রে। এ ব্যবস্থা উচ্চ ও নিম্ন আদালতে বিদ্যমান মামলাজট কমাতেও সহায়ক হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। আমরা দেখতে চাইব, বিশেষ পরিস্থিতিতে সূচিত এ ধারা স্বাভাবিক সময়েও অব্যাহত থাকবে এবং ক্রমেই সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ হতে থাকবে।