সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে বাউল রণেশ ঠাকুরের ঘরে আগুন লাগানোর খবরে আমরা বিক্ষুব্ধ হলেও বিস্মিত নই। পদ্মা-যমুনা-মেঘনা অববাহিকার অন্যান্য এলাকায় বাউল সাধকদের ওপর যে বহুমাত্রিক হামলা ও নিপীড়ন চলে আসছে, কালনীতীরের এই অঘটন তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বস্তুত এর আগে একই গ্রামের সন্তান এবং গোটা দেশের গর্ব বাউল শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গীত চর্চাতেও ২০১০ সালে বাধা দিয়েছিল স্থানীয় একটি পক্ষ। তারই শীর্ষ এবং ভাটি অঞ্চলের জীবিত বাউলদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় রণেশ ঠাকুরের সংগীত চর্চায়ও এর আগে বিঘ্ন ঘটানোর অপচেষ্টা চলেছে। তার সংগীত চর্চার ঘরে আগুন নিঃসন্দেহে তারই ধারাবাহিকতা। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বাউলের প্রতিবেশীদের সঙ্গে জমিজমা সংক্রান্ত যে বিরোধের কথা উঠে এসেছে, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। কিন্তু আমরা মনে করি, এ আগুনের কারণ নিছক বৈষয়িক নয়। তাহলে কেবল সংগীত চর্চার ঘরটি নিশানা করা হতো না। এমনকি ওই ঘরে থাকা গৃহপালিত পশুগুলোকে বাইরে বের করে দিয়ে আগুন লাগানো হয়েছে। পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে বাউলের প্রিয় দোতরাসহ সব বাদ্যযন্ত্র ও গানের খাতাগুলো। এ থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে, দুর্বৃত্তদের ক্ষোভ আসলে কিসের ওপর। গুরুভাই শাহ আব্দুল করিমের পথ ধরে রণেশ বাউল অন্যদের যে সংগীত শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তা কাদের অপছন্দ হতে পারে তা আমরা জানি।
মনে রাখতে হবে, রণেশ বাউলের সংগীতঘরে আগুন নিছক নাশকতা নয়। কেবল একজন ব্যক্তি বা কোনো এক গ্রামের গোষ্ঠী বিশেষের ওপরও হামলা নয়। এর নিশানা আসলে সেই সংস্কৃতি, যা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলে। সংগীতের যে ধারা হাজার বছর ধরে ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা দিয়ে থাকে, যারা ধর্মের ভেদাভেদের বাইরে বৃহত্তর মানবতার জয়গান গেয়ে থাকে, সেই ধারা ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তির পছন্দ হবে কেন? করোনা পরিস্থিতিতে সবাই যখন ঘরবন্দি, তখনও রাতের আঁধারে অন্যের ঘরে আগুন দেওয়ার মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তরা নিজেদের জিঘাংসাই স্পষ্ট করেছে। আমরা মনে করি, রণেশ বাউলের বাদ্যযন্ত্রে আগুন দিয়ে তারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশেরই কণ্ঠ রোধ করতে চেয়েছে। দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে আমরা সাম্প্রদায়িক শক্তির এই দুর্বৃত্তপনা মেনে নিতে পারি না। নিজের মতো করে ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার অধিকার কেবল রণেশ ঠাকুর বা অন্যান্য বাউলের নয়, সব নাগরিকেরই রয়েছে। আমরা মনে করি, তাদের সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একই সঙ্গে সমাজের অসাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকেও এ ধরনের দুর্বৃত্তপনার প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে হবে।
আমরা দেখেছি, আগুন লাগার পর রণেশ ঠাকুরের প্রতিবেশীরা তা নেভাতে এগিয়ে এসেছে। সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এসেছে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলও। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাড়া দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষে ইতোমধ্যে তার ভিটায় নতুন করে ঘর তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, কেবল বৈষয়িক ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক সহমর্মিতাই যথেষ্ট নয়। এই অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা দেখতে চাই, সুনামগঞ্জের পুলিশ ও প্রশাসন ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে কাজ করছে। আগুন দেওয়ার হোতারা যদি আজ পার পেয়ে যায়, তাহলে কাল তারা আরেকজন বাউলের বাড়িতে আগুন দেবে। বাধা ও বিঘ্ন ঘটাতে চাইবে অন্য কোনো সম্প্রদায়ের ধর্ম বা সংস্কৃতি চর্চায়। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন বাউলের ওপর হামলার ঘটনায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না আমরা। আমরা দেখতে চাই, উজানধল, দিরাই বা সুনামগঞ্জের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠগুলোও বাউল রণেশ ঠাকুরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের উদ্যোগে ঘর পুনির্নির্মিত হতে পারে, পুলিশের তৎপরতায় আসামিরা আটকও হতে পারে, ফের সৃষ্টি হতে পারে নতুন গান, সুর ফিরে পেতে পারে সাধের দোতারা; কিন্তু বাউলের মনে সাহস জোগাতে হলে আশপাশের মানুষকে পাশে থাকতেই হবে। ভুলে যাওয়া চলবে না, আমাদের সংস্কৃতি চর্চা যদি বন্ধ হয়ে যায়, সাম্প্রদায়িকতার আগুনই কেবল সম্প্রসারিত হতে থাকবে। আর নগরে আগুন লাগলে কারও দেবালয়ই রক্ষা পাবে না।

বিষয় : বাউল রণেশ ঠাকুর

মন্তব্য করুন