বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পদক

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মিল্টন বিশ্বাস

মুজিববর্ষে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর 'জুলিও কুরি' শান্তি পদকপ্রাপ্তির ৪৭ বছর পূর্তি উদযাপন করছি আমরা। কারণ, করোনাকবলিত বিশ্বে শান্তির ললিত বাণী মানুষকে মহামারি থেকে রক্ষার জন্য খুব বেশি কাজে লাগছে। এই যে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সম্মিলিতভাবে মহামারি মোকাবিলার প্রত্যয় ঘোষণা, দুর্দশায় পতিত মানবজাতিকে উদ্ধারের জন্য নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ব্যবহার করা- এসবই ছিল বঙ্গবন্ধুর মধ্যে। এ জন্যই বিশ্ব শান্তি পরিষদ বিশ্বের নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আন্তর্জাতিক এই পদকে ভূষিত করে সাম্য-মৈত্রী, গণতন্ত্র রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শান্তি পদক সম্পর্কে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পদকে ভূষিত হওয়া ছিল বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
১৯৭৩ সালের ২৩ মে বিশ্ব শান্তি পরিষদের উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পদক প্রদান করা হয়। জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় উন্মুক্ত চত্বরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের বিশাল সমাবেশে পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র বলেন, 'শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।' বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'এ সম্মান কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়। এ সম্মান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী শহীদদের, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানীদের।'
নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি বিজ্ঞানী ম্যারি কুরি ও পিয়েরে কুরি দম্পতি বিশ্ব শান্তির সংগ্রামে যে অবদান রেখেছেন, তা স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ১৯৫০ সাল থেকে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে, মানবতার কল্যাণে, শান্তির সপক্ষে বিশেষ অবদানের জন্য বরণীয় ব্যক্তি ও সংগঠনকে জুলিও কুরি শান্তি পদকে ভূষিত করে আসছে। ফিদেল কাস্ত্রো, হো চি মিন, ইয়াসির আরাফাত, সালভেদর আলেন্দে, নেলসন ম্যান্ডেলা, ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, কবি পাবলো নেরুদা, জওহরলাল নেহেরু, মার্টিন লুথার কিং, লিওনিদ ব্রেজনেভ প্রমুখ বিশ্ব নেতা এই পদকে ভূষিত হয়েছেন। অতীতে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মতো বঙ্গবন্ধুও ছিলেন বিশ্বের মুক্তিকামী, নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। শান্তি, সাম্য, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। জেল, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেছেন। তার অতুলনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা, রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, মানবিক মূল্যবোধ, ঐন্দ্রজালিক ব্যক্তিত্ব বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু- 'বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড'। পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়'। ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংঘাতময় পরিস্থিতি উত্তরণে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছিল জোট নিরপেক্ষ নীতি এবং শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ। তিনি বলেছিলেন, 'পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।' বঙ্গবন্ধু ছিলেন আফ্রো-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার মুক্তিকামী মানুষের মহান নেতা এবং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও শান্তি আন্দোলনের পুরোধা। ১৯৭১-এর পর গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংঘাতময় পরিস্থিতির অবসানে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার
উদ্যোগ নেন।
বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পদকপ্রাপ্তির এই দিন স্মরণের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল আদর্শের শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিশ্ব শান্তি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতার অবদানকে সামনে আনলে যে কোনো সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যতেও আমরা সক্ষম হবো। শেখ হাসিনার সরকার বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবসময় জাতির পিতার নীতি ও আদর্শকে অনুসরণ করছে। শান্তির জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
writermiltonbiswas@gmail.com

বিষয় : বঙ্গবন্ধু