ক্রান্তিকালে উৎসব

ঈদুল ফিতর

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সেলিনা হোসেন

আমাদের দেশ ও সমাজে নানা রকম উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে। বলা যায় উৎসব আমাদের জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এবার এক মর্মন্তুদ প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর সমাগত। করোনাভাইরাসের সংক্রমণে প্রায় গোটা বিশ্বে মর্মন্তুদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আমরাও এর বাইরে নই। রমজানের শেষে সমাগত ঈদে আমরা আমাদের ধর্মীয় কর্ম সম্পন্ন করব স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে, সরকার নির্দেশিত নিয়মনীতি মান্য করে। এবার সঙ্গত কারণেই উৎসব আকারে ঈদুল ফিতর উদযাপনের অবকাশ নেই। তবুও অনুভূতির তো নানা রকম তাগিদ থাকেই। আমরা ঈদের পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতা কিংবা ব্যাপকতার কাটছাঁট করে এবার যদি দৃষ্টি দিই সামাজিক পরিসরে এবং সেই অনুসারে বিপন্ন বিপর্যস্তদের পাশে দাঁড়াই মানবিকতার হাত আরও প্রসারিত করে, তবেই আশা করি পবিত্র দিনের মাহাত্ম্য আরও বেশি পরিস্ম্ফুটিত হবে ভিন্ন আঙ্গিকে।
করোনা দুর্যোগের বহুমুখী বিরূপ প্রভাব সমাজ জীবনে গাঢ় ছায়া ফেলেছে। অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। জীবিকার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বিপর্যস্তদের সহায়তায় সরকারি নানা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সরকার বিভিন্নভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, বিপন্নরা যাতে দুর্যোগ কাটিয়ে ফিরে আসতে পারে স্বাভাবিক জীবনে। সামাজিক, ব্যবসায়িক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রসারিত করেছেন সহায়তার হাত। ব্যক্তি পর্যায়েও চলছে মানবিক কার্যক্রম। করোনা দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে এবার ঈদে আমাদের সবাইকে পারিবারিক আনুষঙ্গিক খরচ কমিয়ে তা দিয়ে আরও বেশি মানবিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া বাঞ্ছনীয় মনে করি। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলেরও সেই নিরিখেই তাদের কার্যক্রম আরও বেগবান করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করোনা প্রতিরোধে সহায়ক শক্তি। বিপন্নজনের মাঝে আমরা যদি নিজেদের খরচের খতিয়ান সংকুচিত করে তা দিয়ে পুষ্টিকর খাবার কিংবা পণ্য বিতরণে আরও উদ্যোগী হই, তাহলে এর ফল হবে ইতিবাচক। ধর্মের অন্যতম নির্দেশনা- মানবিকতার প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া। তাই বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশনার প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হতে আমাদের তাগিদ দেয়। যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আমাদের সামাজিক উদ্যোগের ব্যাপক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত সামনে রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে চলমান সহায়তা কার্যক্রমের সঙ্গে যদি আরও বলিষ্ঠ সামাজিক উদ্যোগ যুক্ত হয়, তাহলে সময়ের বিরূপ প্রভাব কেটে যেতে অনেকটাই হবে সহায়ক।
যে কোনো উৎসবের অন্যতম দিক হচ্ছে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি-মৈত্রীর সেতুবন্ধ আরও পোক্ত করা। উৎসব আমাদের সেই পথই সৃষ্টি করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রক্তস্নাত এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সম্প্রীতির বন্ধন নিয়ে আমরা গর্ব করি। নিশ্চয়ই এই গর্ব অমূলক নয়। আমাদের এই গর্বের প্রেক্ষাপটও অনেক বিস্তৃত। আমাদের সমাজে 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার'- এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। উৎসব মানবিক আবেগের আনন্দঘন এক সর্বজনীন বহিঃপ্রকাশ। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে উৎসব সম্পর্কিত। আর এ প্রসঙ্গে ধরে নিতে হবে যে, শুরুর সময় এই উৎসব ছিল ব্যক্তির- তার হৃদয় অনুভবের আনন্দ উচ্ছল বর্ণাঢ্য প্রকাশ। কাল পরিক্রমায় তা ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে প্রসারিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সমষ্টি থেকে গোত্রে, গোত্র থেকে জাতিতে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর কোনো কোনো উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।
উৎসব মানেই মানুষের মিলন মেলা। উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এ দেশের উৎসব জাতীয় জীবনে মুকুটমণিস্বরূপ। এই উৎসবকে মোটা দাগে তিনটি বৈশিষ্ট্যে ভাগ করা যায়। যেমন- সাংস্কৃতিক উৎসব, জাতীয় দিবসের উৎসব, ধর্মীয় উৎসব। ঈদুল ফিতর আমাদের একটি ধর্মীয় উৎসব হলেও এই মিলন মেলা প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-উচ্ছ্বাস সবকিছুকে গৎবাঁধা জীবনের ঊর্ধ্বে অন্যরকম আস্বাদনের আনন্দ উপভোগ করতে চায়। উৎসবের মূল সুর চিন্তার বাইরে সত্য, সুন্দর এবং শুভবোধের মধ্যে আপন চেতনাকে প্রসারিত করা।
আগেই বলেছি, বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই উৎসব আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়। কিন্তু এবারের দুর্যোগকালীন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এই আনন্দ আমরা খুঁজে নেব বিপন্নজনের মুখে হাসি ফুটিয়ে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আমাদের সচেতন অনুভূতির বোধ আরও পুষ্ট করে। আমরা সামাজিক পরিসরে ঈদের জামাতের মধ্য দিয়ে ভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন আরও দৃঢ় করে নেওয়ার অবকাশ খুঁজি, তা এবার খুঁজে নিতে হবে ঘরে বসে কিংবা সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অন্যরকম প্রয়াসে। ঈদ উৎসবে পুরান ঢাকায় মেলাসহ নানা রকম অনুষ্ঠানের রেওয়াজ গড়ে উঠলেও এবার তা হচ্ছে না। তাতে নিরাশ হওয়ার কিংবা মন খারাপের কিছু নেই। আমাদের সচেতনতায়-সতর্কতায় যদি বিপর্যয় থেকে রক্ষার পথ প্রশস্ত হয়, তাহলে তাই তো অবলম্বন করা শ্রেয়। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা ঐতিহ্যকে বুকে লালন করে আগামীর জন্য পথ রচনা করব। উৎসব মানুষকে মানবিকতার যে মহামিলন ক্ষেত্রে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, আমরা সেই অনুভূতি নিয়েই এগিয়ে যাব। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক সহমর্মিতা আরও পুষ্ট করব নব অঙ্গীকার প্রত্যয়ে। উৎসব ধর্মের ভিন্নতার ঊর্ধ্বে মানুষকে এক জায়গায় জড়ো হতে সহায়তা করে। তাই উৎসব জীবনের আনন্দের ও মঙ্গলের। এবার দুর্যোগে আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে থাকব আরও নিবিড়ভাবে এবং সবরকম ব্যক্তিবিলাস, আড়ম্বর বর্জন করে আরও মানবিকতা প্রকাশে প্রত্যয়ী হবো।
আমরা যদি একে অন্যের পাশে বিশেষ করে যারা অসহায় তাদের পাশে আরও উদাত্তভাবে দাঁড়াই, তাহলে উৎসব যে মানুষের মহামিলনকে মূর্ত করে দেয় মানবিকতার ছোঁয়ায় তার প্রকাশ হবে আরও ব্যাপক। উৎসবের রূপান্তর ঘটে, কিন্তু টিকে থাকে তার নির্যাসটুকু। উৎসব শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, উৎসব আবেগের, উৎসব পরিচয়ের এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার আরও বিস্তৃতকরণের। আমাদের অনেক উৎসবই অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রীতির নিদর্শন। দুর্যোগের মেঘ কেটে চারদিকে আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে পড়ূক। জয় হোক মানবতার। সব অশুভের যবনিকাপাত ঘটুক। ঐতিহ্যের কল্যাণধর্মী মানবিক চেতনা বর্তমান বিশ্বের মানুষের এক পরম সম্পদ। এই ক্রান্তিকালে কামনা করি, মানুষের হৃদয়ে যেন মানুষেরই ছায়া বিরাজমান থাকে।
কথাসাহিত্যিক

বিষয় : ঈদুল ফিতর