ঈদুল ফিতর

নিরাপদ থাকাই আনন্দ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

দীর্ঘ এক মাস সংযম সাধনার পর বছর ঘুরে আনন্দঘন পবিত্র ঈদুল ফিতর এবার এসেছে এক ভিন্ন আবহ নিয়ে। বিদ্যমান করোনা দুর্যোগের মধ্যেই ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে উপকূলীয় জনপদ। করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় সতর্কতা ও আম্পানের ক্ষতচিহ্ন নিয়েই আমাদের ঈদুল ফিতর পালন করতে হবে। বস্তুত গোটা বিশ্বই করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। প্রায় আড়াই মাস ধরে চলা বাংলাদেশে এর সংক্রমণ এখন বলা চলে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আমরা দেখেছি এ উৎসব পালনেও রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা। প্রতিবছর যেভাবে খোলা ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো, এবার তা হবে মসজিদে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। দেশের সবচেয়ে বড় শোলাকিয়া ঈদগাহেও এবার ঈদের নামাজ হবে না। উপরন্তু মসজিদেও ঈদের জামাতের ক্ষেত্রে করোনা থেকে সুরক্ষার জন্য কিছু সতর্কতামূলক নির্দেশনা ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
ঈদের অন্যতম ঐতিহ্য শহুরে মানুষের নাড়ির টানে 'বাড়ি ফেরা'র ক্ষেত্রে সঙ্গতই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তারপরও চলমান লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বিভিন্নভাবে দলে দলে মানুষের ঢাকা ছাড়ার চিত্র আমরা দেখেছি। ঈদের আগে বাড়ি ফিরতে মানুষ ফেরিতে পারাপার এবং পণ্যবাহী যানবাহন ব্যবহার করছে। এমনকি পুলিশের চোখ এড়াতে রডবোঝাই ট্রাকের ওপর ত্রিপল ঢেকে বাড়ি যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যুর খবর আমাদের ব্যথিত করেছে। অবশেষে প্রশাসন ঈদে বাড়ি ফিরতে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসসহ ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারের 'অনুমতি' দিয়েছে। বিষয়টি আমরা সতর্কতার সঙ্গেই সাধুবাদ জানাব। আমরা চাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্তত এটা নিশ্চিত করুক যে, করোনা উপসর্গ নিয়ে কেউ বাড়ি যাচ্ছে না। অন্যান্য স্বাস্থ্য সতর্কতায়ও নজর দিতে হবে। করোনার পরিসংখ্যান বলছে, অধিকাংশ গ্রাম এখনও নিরাপদ। অবাধে দলবেঁধে, সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে বাড়ি গেলে গ্রামে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে- সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা চাই।
আমরা জানি, পবিত্র রমজানের সামাজিক, মানসিক, আত্মিক তথা বহুবিধ উপকার রয়েছে। মুসলমানরা দীর্ঘ এক মাস ধরে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার মধ্য দিয়ে যে সংযমের অনুশীলন করেন, তা শুধু ইন্দ্রিয়ের কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য-পানীয় থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, অপরাধ প্রবণতা ইত্যাদি যাবতীয় রিপুর তাড়না থেকে বেঁচে থাকাও সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য। রোজা পালনের মাধ্যমে অন্যায়, অবিচার, বিদ্বেষ দূর করে পরার্থপরতায় সুখী ও শান্তিময় জীবন ও সমাজ গড়ার প্রয়াসও রয়েছে। এমনকি সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে রমজান মাসেই মুসলমানরা জাকাত আদায় করে থাকেন। ঈদুল ফিতরের আগেই গরিবের পাশে দাঁড়ানোর অন্যতম মাধ্যম সদকাতুল ফিতর। আমরা দেখেছি, চলমান করোনা দুর্যোগের কারণে কর্মহীন, গরিব, অসহায়ের পাশে মানুষ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে কীভাবে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ভেদাভেদ ভুলে সবাই সবার পাশে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মধ্যে মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি, তা অনন্য। মূলত এই সহমর্মিতা, মানবিকতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষাই দেয় ঈদুল ফিতর।
করোনায় যেভাবে সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, আমরা চাই ঘূর্ণিঝড় আম্পানসৃষ্ট দুর্যোগেও উপকূলীয় এলাকার অসহায় মানুষের পাশে এভাবে সবাই দাঁড়াক। করোনা দুর্যোগের এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় আম্পান তাদের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। এমন সময়ে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে, যখন সেখানকার অনেকেরই হয়তো থাকার ঘরটুকু নেই। সম্পদ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন উপকূলীয় মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিকভাবে ঘর নির্মাণ, অর্থ ও ত্রাণ সহায়তার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত কিংবা সাংগঠনিকভাবে
অন্যরাও তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে অসহায় মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।
আমরা মনে করি, ঈদ উৎসবের সর্বজনীনতা তখনই হবে, যখন সমাজ ও রাষ্ট্রে ভেদাভেদ দূর হবে এবং এটি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সবার উৎসব হয়ে উঠবে। দুর্যোগের আবহে এবারের উৎসবে আমরা প্রত্যাশা করি, সবাই মিলেই দেশের দুর্দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব হবে। এবারের উৎসব আনন্দে আতিশয্যে নয় বরং পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে সহমর্মিতা, মানবিকতা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধনে একত্র হয়ে পালন করি। করোনা দুর্যোগ থেকে নিজে নিরাপদ থাকা এবং অন্যকে নিরাপদ রাখাই হোক এবারের ঈদ আনন্দ। আমরা প্রত্যাশা করি, শিগগির কেটে যাবে দুর্যোগের আঁধার। সমকালের পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ীসহ সবাইকে আমরা জানাই ঈদ মোবারক।

বিষয় : ঈদুল ফিতর