আদালতের পরিসর, ভার্চুয়াল ও অ্যাকচুয়াল

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মঈদুল ইসলাম

'নয়া' করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী মারণ আগ্রাসন মানুষের প্রায় সবকিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছে। দেখার আছে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ (চিত্তের অন্ধতা), মদ (স্বকল্পিত শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ) ও মাৎসর্য (পরশ্রীকাতরতা) মানুষের ষড়রিপুর কয়টির কতটুকু কমে বাড়ে। অনেক দেশ আছে লকডাউনে, অনেকে আছে কারফিউতে। আমরা ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে আছি অসাধারণ এক 'সাধারণ ছুটিতে'। সরকারি ব্যবস্থা হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার 'অ্যালোকেশন অব বিজনেস'-এর ৩৭ নম্বর ক্রমিকের ক্ষমতাবলে সরকারি-বেসরকারি অফিস, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত ব্যবসা সবার ছুটি করে দিয়েছে। জরুরি গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু কিছু রাখা হয়েছে এ ছুটির বাইরে। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অপরাধীদের অন্তরীণ রাখতে উদ্ভাবিত লকডাউন আর আইনশৃঙ্খলা সামলাতে লাগা কারফিউতে না যাওয়া সঠিকই বটে। সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সরকারি সব ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের, তার ওপরে আছে উপদেষ্টা কমিটি। 'স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' ঘোষণা করে জনগণের চলাচল, কাজকর্মের মৌলিক অধিকারগুলোর ওপর বিধিনিষেধ জারি করার কথা তাদের। কিন্তু মাস্ক, পিপিই, ভেন্টিলেটর, রোগী শনাক্ত আর চিকিৎসা নিয়ে তাদের নাকাল অবস্থায় জনপ্রশাসনকেই সরকারি প্রশাসনের বাইরে একবারে জনে জনের ছুটি দেওয়ার ক্ষমতা নিতে হয়েছে। আইনের তর্ক উঠলে 'ডকট্রিন অব নেসেসিটি' থিওরি তো আছেই। জনপ্রশাসনের বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়েই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন দেশের সব আদালতের 'সাধারণ ছুটি' দিয়ে চলেছে।
বিশ্বের কোথাও 'হাইবারনেশন'-এ স্থবির নিশ্চল হয়ে নেই, মানুষের জীবনে তা হওয়ার নয়। আমরাও চলছি, সরকারি প্রশাসন চলছে, আইন চলছে। চলবে না কেবল আদালত!
আইন-আদালত কথাটি একসঙ্গেই ব্যবহার হয় আমাদের এখানে। তরুণ আইনজীবীরা দাবি তুললেন আদালত খোলার। এক মাস 'সাধারণ ছুটি'র পর 'সামাজিক দূরত্ব' বজায় রাখার শর্তে সপ্তাহে দু'দিন জরুরি জামিন বিষয়ে আদালত চালাতে প্রধান বিচারপতির আদেশ এলো ২৩ এপ্রিল। অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা হায় হায় করে উঠলেন, আদালতে সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব নয়, সংক্রমণ বেড়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট সে আদেশ প্রত্যাহার করে ২৬ এপ্রিল ফুল কোর্টসভায় রাষ্ট্রপতির কাছে ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় আদালত চালানোর অধ্যাদেশ চাইলেন। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ৯ মে জারি হলো 'আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০' (২০২০ সালের পহেলা অধ্যাদেশ)। মাত্র পাঁচটি ধারার এ অধ্যাদেশে প্রায়োগিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান করার দায়িত্ব প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত করে পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও মাত্র এক দিনের মধ্যে 'বিশেষ প্র্যাকটিস নির্দেশনা' জারি করেন। আইনজীবীদের জন্যও 'আমার আদালত :ভার্চুয়াল কোর্টরুম ব্যবহার ম্যানুয়াল' প্রকাশ করে। তার পরের দিন থেকেই জেলার আদালতগুলোতে জরুরি জামিন এবং সুপ্রিম কোর্টে জরুরি বিষয়ে ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় দূর শুনানি শুরু হয়েছে। আইনজীবীদের তরুণ অংশ প্রোৎসাহে এগিয়ে আছেন, যার যা আছে তাই নিয়ে। বয়োজ্যেষ্ঠদের একটি অংশ জড়তায় আছেন। তাদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় ডিভাইস, ব্যবহারিক জ্ঞান, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, ইন্টারনেটের গতি নেই। ইন্টারনেটের অগতি তো সেদিনই হয়েছে, যেদিন সাবমেরিন কেবল আমাদের সমুদ্রতলদেশ দিয়ে যাওয়া ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এখন আকাশেই (স্যাটেলাইটে) ভরসা। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া কাজে নামা আদালত, আইনজীবীদের তো নতুন নয়। ১৯৮২ সালে ঢাকার বাইরে ছয়টি শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ, উপজেলাগুলোতে মুনসেফ ও ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট বসেছিল আদালত ভবন, আসবাবপত্রের অভাব নিয়েই। প্রায় ১০ বছরে যখন অভাব দূর হয়ে স্বাভাবিক হয়ে আসছিল, তখন ১৯৯১ সালে হাইকোর্ট বেঞ্চগুলো এবং ১৯৯২ সালে উপজেলা আদালতগুলো উঠিয়ে আনা হয়। সে সময় সুপ্রিম কোর্ট মূল ভবনের বাইরের বারান্দায় দেয়াল তুলে ওইসব বিচারপতির খাস কামরা বানানো হয়, এজলাস ভাগাভাগি করে কাজ শুরু হয়। সেই সৌন্দর্যহানি নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে মূল ভবন। উপজেলা আদালতগুলোকে জেলায় বসতে হয়েছিল গাড়িবারান্দা, গ্যারেজ ঘিরে আর চেম্বার-এজলাস ভাগাভাগি করে। ২০০৭ সালে নভেম্বরে যখন ম্যাজিস্ট্রেসি জুডিশিয়ারিতে আসে, তখনও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের বসতে হয়েছিল সেই ভাগাভাগি করে আর জেলার অন্য কারও অব্যবহূত পরিসরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। প্রস্তুতি, সরঞ্জাম ছাড়া চলাই বোধ হয় আদালত-সংশ্নিষ্টদের নিয়তি। ভার্চুয়ালের সমস্যাও সয়ে যাবে অভ্যাসে। ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে ভাবতে হবে, কেন থাকে না এসব।
ভার্চুয়ালে জামিন শুনানি আপৎকালীন ব্যবস্থা। শিগগিরই যাচ্ছে না এ ভাইরাস, আমাদের আগামী বসবাসের সঙ্গেই চলবে বেশ কিছু বছর। ততদিন সবাই গৃহবন্দি থেকে ভার্চুয়ালে জামিন আর জরুরির দূরশুনানিতেই আদালতকে আটকে রাখা তো চলবে না। নিয়মিত আদালতের সব কাজে আসতে হবেই। ইন্টারনেট, তথ্যপ্রযুক্তি যেভাবে গ্রাস করে চলেছে, তাতে একে এড়িয়ে চলা এখন অকল্পনীয়। বেশিরভাগ দেশের আদালত অনেক আগে থেকেই এসব আয়ত্তে নিয়ে কাজের গতি এনেছে। এই প্রযুক্তিতে মামলার ফাইলিং থেকে শুরু করে শুনানির আগে পর্যন্ত অনেক কাজই সাধারণ ব্যাপার তাদের। ডিজিটাল আর্কাইভ আছে রায়-আদেশের, সেখান থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থাও আছে। চিরকালীন ব্যবস্থা হিসেবে আমাদেরও সেসব করতে হবে। ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স সম্পর্কে সাক্ষ্য আইনে বিধান দরকার।
ভার্চুয়াল আর অ্যাকচুয়াল দুই পরিসরকেই উন্নত করার প্রস্তুতিটা শুরু করতে হবে এখনই। না হলে আবারও নামতে হবে প্রস্তুতিবিহীনভাবে। এরই মধ্যে যেসব দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তারা স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাদি নিয়ে খুলতে যাচ্ছে সবকিছু। বাকিরাও প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদেরও প্রস্তুতি চলছে। 'বাংলাদেশে কভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমান্বয়ে চালু করার সুবিধার্থে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও পেশার জন্য কারিগরি নির্দেশনা' নামে একটি পুস্তক ২ মে ২০২০ তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশ করেছে, তাদের ওয়েবসাইটেও রয়েছে। এ পুস্তকে সরকারি-বেসরকারি অফিস, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হাটবাজার, এমনকি পার্ক চালু করতে গৃহীতব্য ব্যবস্থাদি দেওয়া হলেও সুনির্দিষ্টভাবে আদালতের জন্য কোনো ব্যবস্থা দেওয়া নেই। এ পুস্তক এবং যে বিশেষজ্ঞরা এটি তৈরি করেছেন, তাদের সাহায্য নিয়ে আদালতের এবং বারের জন্য গৃহীতব্য ব্যবস্থা এখনই তৈরি করুন, ভাইরাস প্রতিরোধী সরঞ্জাম এখনই জোগাড় করুন। সেসব পালন নিশ্চিত করাতে নিজেরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসুন। পর্যাপ্ত সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত করুন। আরজি-জবাব, জেরা-জবানবন্দি, যুক্তিতর্ক, রায়-আদেশ সংক্ষিপ্ত করুন। সময় ও ফরমেট নির্ধারণ করুন। 'রিজনেবল ডিসট্যান্স' সব ক্ষেত্রেই দরকার, এর ভারসাম্য হারালে টেকে না। সৃষ্টিরহস্যেও তাই আছে। গ্রহ, নক্ষত্র সবই নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখা আছে। দূরত্ব ঘুচে গেলে ভেঙে পড়বে সৃষ্টি। বনে বৃক্ষাদিও নির্দিষ্ট দূরত্ব না হলে টেকে না। স্বাধীনতায় অবাধ্য মানুষকেও দূরত্ববিধান মানতে হবে, নয়া করোনা শিক্ষা দিচ্ছে। আইনজীবী, বিচারক, মক্কেল মানতে হবে সবাইকে। বদঅভ্যাস ছেড়ে শুচিতায় আসতে হবে সবাইকে।
দিন দিন বাড়ছে মানুষ, মামলা, আইনজীবী। বিচারক আর আদালতও বাড়াতে হবে আরও। কিন্তু কোনো আদালতের প্রাঙ্গণে আর তিল ধারণের জায়গা নেই। সুপ্রিম কোর্ট, জেলা আদালত সবার প্রাঙ্গণ বির্ডিংয়ের বন হয়ে গেছে। দূরত্ব মানার আর জায়গা নেই। কোলাহলপূর্ণ পরিসরে বাজার চলে, বিচারের জন্য প্রয়োজন শান্ত-স্নিগ্ধ পরিসর, ভাবগম্ভীর পরিবেশ। এই বাস্তবতায় বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই আজকে, সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ মেনে যেভাবে হবে সেভাবেই। ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ আদালত-সংশ্নিষ্ট উপজেলায় এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতও জেলার বাইরে সুবিধাজনক জায়গা নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এগুলো যদি সেখানেই থাকত, তাহলে আজকের সামাজিক দূরত্ব মানা অনেকখানিই সহজ ছিল।
৩৫ লাখ মামলার যে 'জগদ্দল ভার' চেপে আছে, তা অপসারণের জন্য বিশেষ 'ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' নেওয়া জরুরি। সততা ও কর্মনিষ্ঠতায় সুনাম নিয়ে অবসরে যাওয়া বিচারপতি ও বিচারকদের মধ্যে যারা কর্মক্ষম, তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নিয়োগ দিয়ে মামলাগুলো নিষ্পত্তির সুরাহা করা যায়।
হলেখক ও আইনগ্রন্থকার; সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক
moyeedislam@yahoo.com