বাংলা প্রবাদে 'বোঝার ওপর শাকের আঁটি' চাপানোর কথা আমরা জানি। দুই মাসের বেশি সময়ের বিরতির পর 'সীমিত পরিসরে' গণপরিবহন চালু হলেও বাসভাড়া ৬০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে যেন সেই প্রবাদেরই প্রতিফলন ঘটানো হলো। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে টানা দুই মাস সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে দ্বিমতের অবকাশ নেই। করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হার যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন সীমিত পরিসরে হলেও অফিস-আদালত ও গণপরিবহন চালু করা কতটা সংগত, তা নিয়ে অবশ্য রয়েছে পরস্পরবিরোধী মতামত। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা এ বিষয়ে একাধিকবার আলোকপাত করেছি। সমকালের সাম্প্রতিক বিভিন্ন উপসম্পাদকীয়তে আমরা প্রকাশ করেছি উভয় পক্ষের অভিমত। কিন্তু করোনার এই সময়ে ভাড়া বৃদ্ধি আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ভিন্ন এক প্রশ্নের মুখে। দুই মাস ধরে কর্মহীন যাত্রীসাধারণ বাড়তি ভাড়ার এই চাপ কীভাবে বহন করবে? অনুমান করা কঠিন নয় যে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার বৃদ্ধির এ সময়েও যারা গণপরিবহন ব্যবহার করবেন, তাদের অন্য কোনো উপায় নেই। জীবন ও জীবিকার তাগিদেই তারা রাস্তায় নামবেন। সেখানে যদি বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? যে স্বাস্থ্যবিধি মানার দোহাই দিয়ে বাসে আসনসংখ্যার অর্ধেক যাত্রী তোলার কথা বলা হচ্ছে এবং তার জের ধরে বাস ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে, তাই বা কতখানি মানা হবে?
অস্বীকার করা যাবে না যে, বেসরকারি মালিকানাধীন গণপরিবহন ব্যবস্থার চালক, সহকারী, শ্রমিক-কর্মচারীরাও করোনাকালের দুঃসময়ের শিকার। তারাও দুই মাস ধরে কর্ম ও উপার্জনহীন। বিপুল বিনিয়োগের বাস অলস বসে থাকায় মালিকদের ক্ষতিও নিশ্চয়ই ধর্তব্য। এর ওপর স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে যদি অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখতে হয়, তাহলে জ্বালানি খরচ ও পারিশ্রমিক ব্যয় তোলাও ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে বৈকি। আমাদের কথা হচ্ছে, সর্বব্যপ্ত দুঃসময়ের সেই দায় যাত্রীদের কাঁধে চাপানো কতটা যৌক্তিক? বিষয়টি অন্যভাবেও দেখার সুযোগ রয়েছে। সব গণপরিবহন দুই মাস বসে থাকায় এর সঙ্গে জড়িত বেসরকারি শ্রমিক-কর্মচারীদের নূ্যনতম জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। এখন যখন সীমিত পরিসরে চালু হচ্ছে, তখন সেটাকেই নূ্যনতম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না? আমরা দেখছি- নিছক ভাড়া বৃদ্ধি নয়, এক লাফে ৬০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর অর্থ স্বাভাবিক সময়ে যে স্থানীয় ও দূরপাল্লার বাসগুলো পেত, প্রায় তাই এখনও পাবে। তাহলে দুঃসময়ের দায় কেবল যাত্রীই বহন করবে? আমরা মনে করি, আগের ভাড়াই বহাল রাখা উচিত। আমরা বলছি না, বাস মালিকরা লোকসান দেবে বা শ্রমিক-কর্মচারীরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবে। আমরা বলতে চাই- বাস পরিচালনার ব্যয় যৌক্তিকভাবে হিসাব করে যাত্রীদের কাছ থেকে যে অর্থ কম আদায় হবে, তা সরকার প্রণোদনা হিসেবে দিক। বাস মালিকদেরও এ দুঃসময়ে মুনাফায় ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
আমরা মনে করি, করোনার দুঃসময়ে কর্মহীন মানুষের কাঁধে ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া চাপানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তার বদলে বাসের পরিচালন ব্যয় ঘাটতির অর্থ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে নিয়ে সুসময়ে ফেরত দেওয়ার কথা ভাবতে পারে বাস মালিকরা। আমরা জানি, এখনও লঞ্চের ভাড়া নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। বাসের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন সেখানে ঘটলে তা হবে আরও দুর্ভাগ্যজনক। বস্তুত গোটা গণপরিহন ব্যবস্থায় সাময়িক হলেও যাত্রীবান্ধব নীতি গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে যে চার শর্তে বাস পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, তাও মানতে হবে কঠোরভাবে। দূরপাল্লা বা সিটিং বাসে যত্রতত্র যাত্রী তোলা, নামানো বা দাঁড় করিয়ে নেওয়া আগেও নিষিদ্ধ ছিল; কিন্তু তা সামান্যই প্রতিপালিত হতো। করোনাকালেও যদি একই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তা হবে যাত্রী ও বাস শ্রমিক নির্বিশেষে সবার জন্য আত্মঘাতী। আর অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার নিয়মও যদি মানা না হয়, তা হবে যাত্রীদের জন্য পয়সা দিয়ে রোগ কেনার নামান্তর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বর্ধিত ভাড়া কতটা 'স্বাভাবিক' হবে, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে। অতীতে আমরা এর নজির দেখিনি। এবারও তার পুনরাবৃত্তি হলে দুঃসময়ে 'সাময়িক' ভাড়া বৃদ্ধি যাত্রীদের স্থায়ী দুর্ভাগ্য হয়েই থাকবে।