এই লেখা যেদিন প্রকাশ হতে যাচ্ছে, আজ ১০ জুন বুধবার, সেদিন বিকেলেই জাতীয় সংসদে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের বাজেট অধিবেশন। আগামীকাল ১১ জুন, জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। সেদিক থেকে আসন্ন বাজেট ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমাদের এই যৌথ লেখার প্রাসঙ্গিকতা সামান্য। কিন্তু আমরা মনে করি, নদীমাতৃক বাংলাদেশে বাজেট সামনে রেখে অন্যান্য খাতের মতো নদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ ও বৃহত্তর অর্থে পরিবেশ নিয়েও আলোচনা হওয়া জরুরি। এই লেখা তার সূচনা মাত্র। আগামী দিনগুলোতে এ ব্যাপারে আরও সময়োচিত ও সংঘবদ্ধ আলোচনা ও মতবিনিময় করব আমরা।
আমরা বিশ্বাস করি, বাজেট অধিবেশন শুরুর দিন প্রকাশ হলেও আমাদের এই যৌথ লেখায় উত্থাপিত ইস্যুগুলো সংসদ সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। তারা যদি আমাদের উত্থাপিত সুপারিশগুলো সঙ্গত মনে করেন, তাহলে বাজেট আলোচনায় তুলে ধরতে পারবেন। তাতে করে বাজেট পাসের আগে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন নিশ্চয়ই সম্ভব হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব দেশের নদনদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা এবং এগুলোর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন ও জীবিকায় প্রতিফলিত হবে।
আমরা স্বস্তির সঙ্গে দেখছি, গত এক দশক ধরে জাতীয় বাজেটে নদনদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ ও পরিবেশ সুরক্ষা সম্পর্কিত বরাদ্দ বাড়ছে। এজন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সাধুবাদ পেতে পারে। বস্তুত নদী ও পানিসম্পদ সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ও আন্তরিকতা সম্পর্কে আমরা সম্যক অবহিত রয়েছি। আমরা দেখেছি, ২০১৯-২০ অর্থবছরেও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আমাদের মনে আছে- বিদায়ী অর্থবছরে তার আগের অর্থবছরের তুলনায় নদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ ও পরিবেশ সুরক্ষা খাতে সার্বিক বরাদ্দই কেবল বাড়েনি; বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় এসব খাতে নতুন অথচ জরুরি কিছু বিষয়ে উদ্যোগের কথাও বলেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সারাদেশে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খনন কার্যক্রম। প্রথমবারের মতো ব-দ্বীপ পরিকল্পনার আওতায় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বরাদ্দ ছিল নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ ও ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্পে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও উপকূলীয় বাঁধে নির্মাণ ও সংস্কারে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য সহায়ক আঞ্চলিক নৌপথ সম্প্রসারণেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বেসিন কমিশন গঠনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। পাশাপাশি দখল, দূষণ প্রতিরোধসহ নদনদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত গতানুগতিক বরাদ্দ তো ছিলই।
আমরা দেখতে চাই, আসন্ন বাজেটে নদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ খাতে বরাদ্দ আরও বেড়েছে। অস্বীকার করা যাবে না যে, এবার বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপন হয়েছে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে। বিশ্বের মতো বাংলাদেশও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। অনেকের জীবন থেমে যাওয়ার পাশাপাশি বহুলাংশে থমকে গেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদান, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রভৃতি খাতেও দিতে হবে বিশেষ মনোযোগ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন টেকসই রাখতে হলে পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষায়ও মনোযোগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এও ভুলে যাওয়া চলবে না, করোনাভাইরাসের মতো পরিস্থিতির উদ্ভবই হয়েছে প্রকৃতির প্রতি নির্বিচার নির্যাতনের কারণে। আর বাংলাদেশে প্রকৃতি মানেই বহুলাংশে পানি-প্রকৃতি। নদনদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ অক্ষুণ্ণ থাকলে প্রকৃতির অন্যান্য সন্তান নির্বিঘ্ন থাকতে পারে।
বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু বাস্তবায়নও জরুরি। চলতি অর্থবছরে আমরা দেখেছি, ১০ হাজার কিলোমিটার নদীপথের নাব্য পুনরুদ্ধারে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদী খনন কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু ইতোমধ্যে এসব ব্যাপারে উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ। রিভারাইন পিপল থেকে আমরা দেখেছি, উত্তরাঞ্চলের অনেক নদীর প্রাকৃতিক প্রস্থ সংকোচনের মাধ্যমে খনন করা হচ্ছে। এ ধরনের 'বাস্তবায়ন' বরাদ্দ অর্থে নদীর বরং ক্ষতিই করছে। ইতোমধ্যে চলমান এ ধরনের ক্ষতিকর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধের পাশাপাশি নতুন করে যেন এভাবে নদীকাঠামো ও তার প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি না করা হয়, সেদিকে নজর দিতে বলি আমরা। নদী খননের ক্ষেত্রে নদীর প্রতিবেশগত স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে হবে।
আমরা দেখেছি, দেশজুড়েই নদনদীর জন্য নতুন বিপদ হিসেবে ক্রমেই সর্বব্যাপ্ত হয়ে উঠছে নির্বিচার বালু উত্তোলন। করোনাকালেও দেশের বিভিন্ন নদীতে বালু দস্যুরা দিনরাত সক্রিয় রয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়- নদী, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ, জীবিকা ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিনষ্টকারী এবং নদীভাঙন ও ভরাটের জন্য দায়ী এই বালু উত্তোলন নিয়ে বাজেটে কোনো প্রতিশ্রুতি থাকে না। আমরা আসন্ন বাজেটে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেখতে চাই। বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমরা জানি, নদীভাঙন রোধে লোকায়ত জ্ঞান ও ঐতিহ্যগত প্রযুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায়। এর একটি স্বল্প খরচ ও পরিবেশবান্ধব 'বান্ধাল'। নদীভাঙন রোধের বিপুল ব্যয়ের প্রকল্পগুলোর বিকল্প হিসেবে বান্ধাল জনপ্রিয় করতে আসন্ন বাজেটে বরাদ্দ রাখতে বলি আমরা। নদনদী পর্যায়ে মৎস্যসম্পদ সুরক্ষা ও বৃদ্ধিতেও উদ্যোগ দেখতে চাই। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার, মেরামতে বিশেষ ও বাড়তি বরাদ্দ দিতে হবে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান সেই তাগিদই দিয়ে গেল। একই সঙ্গে নদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ ও পরিবেশ সংক্রান্ত অন্যান্য খাতেও দেখতে চাই নতুনতর প্রতিশ্রুতি এবং পুরোনো প্রতিশ্রুতির আন্তরিক বাস্তবায়ন।
আমরা দেখতে চাই- নদী, জলাভূমি, পানিসম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, আসন্ন বাজেটে বরাদ্দের ক্ষেত্রেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থের সদ্ব্যবহারে মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইনের প্রয়োগেও থাকতে হবে একই প্রতিশ্রুতি ও প্রতিফলন।

লেখকবৃন্দ নদী, জলাভূমি ও পানিসম্পদ বিষয়ে চিন্তা ও তৎপরতায় জড়িত; নদীবিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের উদ্যোগে এই নিবন্ধের সঙ্গে সূচিবদ্ধ
riverine.people@gmail.com