আনারসের ভেতরে বিস্টেম্ফারক ভরে হাতিটিকে খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। আহত হওয়ার পরও হাতিটি কাউকে আঘাত না করে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। হাতিটি এতটাই শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেছিল যে, সে টানা তিন দিন নদীতে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতিটিকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে পানি থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। তিন দিন ধরে হাতিটির মুখ এবং শুঁড় পানির নিচেই ছিল। পানির নিচে থেকে সে পানি পান করেছিল, যা সম্ভবত তাকে কিছুটা আরাম দিয়েছিল। হাতিটির চোয়ালের দুই পাশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং তার দাঁতও ভেঙে গিয়েছিল। অবশেষে ২৭ মে নদীতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই হাতিটি মারা যায়। ঘটনাটি ভারতের কেরালার।
হাতি নিয়েই দ্বিতীয় ঘটনা বাংলাদেশের কক্সবাজারে। গত জানুয়ারিতে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন- 'বন্যহাতি মাকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মৃত মায়ের দেহ আগলে রেখে মাতম করছে একটি বাচ্চা। এই দৃশ্য শত শত মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে দিয়েছে। বাচ্চা হাতিটির মর্মস্পর্শী এই কাণ্ড দেখে অনেকের চোখে পানি নেমে এসেছে।' কেরালার নিষ্ঠুরতার কক্সবাজারের এই ঘটনা নতুন করে সামনে এসেছে। করোনাকালে মানুষের এ ধরনের বিবেকহীনতা আমাদের আঘাত করে। মানুষের জন্য আজ প্রকৃতির এই অবস্থা! যে কোনো প্রাণীর ওপর এমন নির্দয় অত্যাচার, নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতন প্রকৃতিও মেনে নেয় না।
সম্প্রতি প্রকৃতির প্রতি নিষ্ঠুরতার আরও কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ঝড়ো হাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছিল নাটোরের বড়াইগ্রামের বাজিতপুর গ্রামের গাছে ঠাঁই নেওয়া শামুকখোল পাখিগুলো। বাতাসের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে অন্তত ২০০ পাখি মাটিতে পড়ে যায়। পরে গ্রামবাসী পাখিগুলো ধরে নিয়ে জবাই করে রান্না করে খাওয়ার উদ্দেশ্যে।
তিন মাস ধরে গ্রামের বটতলা বাজারের পাশের তিনটি শিমুল গাছে আস্তানা গড়েছিল দুই শতাধিক শামুকখোল পাখি। দিনের বেলায় পাখিগুলো আশপাশের বিলে খাবার খেতে যেত। রাতে গাছে এসে আশ্রয় নিত। এর মাঝে অনেকেই পাখিগুলো শিকার করার চেষ্টা করেছে। তবে অনেকে বাধা দেওয়ায় তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। ঝড়ে কিন্তু পাখিগুলোকে মারেনি, মেরেছি আমরা। আমরা কেন এ রকম? এসব খবর শুনে আমরা খুবই কষ্ট পাই। আমরা কি শুধু নামেই মানুষ? কাজেকর্মে নয়? অসহায় অতিথি পাখি নিধনের ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। পরে যদিও তারা আর কখনও পাখি শিকার করবে না এবং পাখিদের নিরাপত্তা বিধান করবে- এ মর্মে লিখিত মুচলেকা দিয়েছে; কিন্তু পাখিদের জীবনগুলো তো ঝরে গেল!
১৯৭০ সালের পর থেকে পৃথিবীর বন্যপ্রাণীর সংখ্যা অন্তত ৬০ শতাংশ কমছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। বিশ্নেষকদের মতে, এই ধারা চলতে থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ বন্যপ্রাণী হারিয়ে যাবে। বন ধ্বংস, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অত্যধিক পরিমাণে পাখি বা মাছ শিকার ইত্যাদি কারণে জলবায়ুর আজ এই অবস্থা। এ অবস্থা কি কোনোভাবেই কাম্য? না। পর্যটকশূন্য কক্সবাজার সৈকতে ডলফিনের খেলার ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে দেখে যখন পর্যটকরা ভীষণ খুশি, ঠিক তখনই সৈকতে অতিথি হিসেবে আসা ডলফিনকে তুলে হত্যার অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সামুদ্রিক প্রাণী হত্যার বিচার করা এখন সময়ের দাবি।
পৃথিবী এবং মানুষের তৈরি সব ব্যবস্থা হোক পরিবেশ, নদী, পশুপাখিবান্ধব। এই অঙ্গীকার হোক আমাদের সবার। পশুপাখি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। যে কোনো ধরনের পরিবেশঘাতী পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে। ভবিষ্যতে যেন এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে খেয়াল রাখতে হবে সেদিকে। মানুষকে সচেতন করে পশুপাখির নিধন বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃতি কেবল মানুষকে নিয়ে গড়ে ওঠেনি এবং আমরা যদি মনে করি কেবল মানুষ বেঁচে থাকবে, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব ইতোমধ্যেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। নদীনালা, পশুপাখি ও অনন্য বন্যপ্রাণী প্রকৃতির সৌন্দর্যকে অসাধারণ করে গড়ে তুলছে। আমরাও যদি প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখি, ভালোবাসি, তাহলে অবশ্যই প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের জন্য সহজ হবে এবং তাহলেই পরিবেশ নিশ্চিত করবে আমাদের বসবাসের জন্য এক অনুকূল সুন্দর পৃথিবী।
হশিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল ময়মনসিংহ
shafiquejkkniu@gmail.com

বিষয় : নিষ্ঠুরতা

মন্তব্য করুন