যদি বলি সব মানুষের ভেতরেই একজন নেতা লুকিয়ে আছেন? অনেকেই মানবেন যে আমরা সবাই নিজেদের কর্মস্থলে এবং নিজের জীবনের আঙিনায় জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মিছিলে এক একজন নেতা। শত শত বছর ধরে ব্যবসায়িক ও করপোরেট খাত তাদের কর্মীদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে নেতা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এটি নতুন নয়। তবে সেই নেতৃত্বের লক্ষ্য ছিল সমাজের অগ্রগতি, মানবসভ্যতার অগ্রগতি।

এই অতিমারির দুঃসময়ে নেতারা কেমন নেতৃত্ব দেবেন? মানুষ তাদের কাছ থেকে কী আশা করছে? তারা কতটুকু সেই আশা পূরণ করতে পারছেন?

করোনাভাইরাস অতিমারি আমাদের জীবদ্দশায় কেউ দেখেনি। এটি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে এমন সময় জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই মানুষ আশা করেছিল এই ভাইরাস যে কতটা ক্ষতিকর তা তাদের নেতারা কতটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, যখন চীনের এক শহর থেকে মানুষের শরীরের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়া শুরু করেছিল।

বিশ্বের অনেক নেতাকেই আমরা দেখেছি সাধারণ মানুষের মতো ভাবতে। তারাও মনে করেছিলেন এটি একটি সাধারণ ফ্লু এবং কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।

ভাইরাস যখন ইতালিতে পৌঁছল, তখনও অনেক নেতা ব্যাপারটি নিয়ে অনিশ্চিত ছিলেন। তখনও তারা ভাইরাসের মারণ-ক্ষমতা অনুধাবন করতে পারেননি। কিন্তু মৃতদেহের সংখ্যা সেখানে যখন বাড়তে শুরু করল তখন অনেক নেতা বুঝলেন এটি কোনো 'স্থানীয়' ভাইরাস নয়; এই ভাইরাসের বিশ্বায়ন ঘটবে এবং কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।

তারা তখনই বুঝে গিয়েছিলেন ও মানুষের জীবন এবং নিজের দেশের অর্থনীতি বাঁচানোর জন্য নানা পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে নিয়েছিলেন এবং নিতে পেরেছিলেন।

বেশিরভাগ নেতা তখনও অনুধাবন করে উঠতে পারেননি যে, এটি একটি অতিমারির রূপ নিতে যাচ্ছে। কারণটা খুব সহজ। এ ধরনের নেতার দূরদর্শিতার অভাব। যারা খুব বেশি স্থানীয় রাজনীতিতে ছোট-ছোট লাভ নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন, তারা ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে বা ঘটতে পারে, তা কম বুঝতে পারেন। বুঝলেও খুব একটা আমলে নেননি তা আমরা বুঝতে পেরেছি।

আমেরিকা একটি অন্যতম উদাহরণ। সেখানকার প্রেসিডেন্টকে আমরা টেলিভিশন খুললেই দেখি কথা বলছেন। তিনি প্রায় সারাদিনই কথা বলেন, নানা উপায়ে। তাকে দেখেছি তিনি তার দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে খুব একটা নিশ্চিত নন। মনে হয়েছে তিনি দেশের অর্থ-বাণিজ্য আগে বাঁচাতে চান। মনে হয়েছে দেশের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা কম, বাণিজ্যের প্রতি বেশি এবং এই ভাইরাসের জন্য নিজেকে ছাড়া বিশ্বের আর সবাইকে দোষারোপ করেছেন। তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে সারাক্ষণ তর্ক করেছেন। তিনি দেশের মানুষকে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন তা তিনি জানেন না বলেই মনে হয়েছে।

একজন মানুষ একটি রাষ্ট্রীয় পদ ধরে রাখলেই যে তিনি নেতা বা লিডার হবেন তা ভাবার কোনো কারণ নেই। মনে আছে বঙ্গবন্ধুকে একদল বিপথগামী হত্যা করেছিল। কিন্তু শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু এখনও আমাদের নেতা। নেতৃত্ব চিৎকার করে সবাইকে জানাতে হয় না। নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা থাকলে তা এমনিতেই বোঝা যায়। আকাশে রংধনুর মতো।

ফিলিপাইন ও ব্রাজিলের নেতারা আমাদের কাছে উদাহরণ হিসেবে অনেক বছর থাকবেন। তারা সংবাদমাধ্যমের কাছে যা যা বলেছেন তা শুনে আমাদের একেবারেই মনে হয়নি যে তারা দেশের মানুষকে ভালোবাসেন বা মানুষের সুরক্ষা চান।

অন্যদিকে আমরা যদি নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকাই, দেখব তিনি কী সুন্দর করে এই দুর্যোগ সামলেছেন। তিনি সব সময় তার দেশের মানুষের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে এবং টেলিভিশনে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তাকে কেউ স্ট্ক্রিপ্ট লিখে দিচ্ছে না। তিনি জানেন মানুষকে কী বলতে হবে। তিনি জানেন এই দুর্যোগ অতিক্রম করতে কী ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি সবাইকে সে দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কথাও জানাচ্ছিলেন।

মানুষের জন্য ভালোবাসা সবার আগে প্রয়োজন। মানুষকে বাঁচাতে হবে, সেই ইচ্ছা প্রকাশ করলে মানুষ নেতাকে মেনে চলবে। সাধারণ মানুষ তাই-ই চায়। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, জার্মানির চ্যান্সেলর, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট, কানাডার প্রধানমন্ত্রী, আমার নিজের প্রধানমন্ত্রী, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী- সবাই মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছেন, মানুষকে বাঁচাতে চেয়েছেন।

নেতৃত্ব শুধু যে জীবনই বাঁচাতে পারে তা নয়, নেতৃত্ব ব্যবসা-বাণিজ্যও রক্ষা করতে পারে। করোনাভাইরাস অতিমারি সারাবিশ্বে ব্যবসা ধ্বংস করেছে। অনেক কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। চাকরিজীবীরা তাদের কর্মস্থলে যেতে ভয় পেয়েছেন, কারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে সবার মনে এক আতঙ্ক জেঁকে বসেছে।

বেশিরভাগ কোম্পানি কোনো সমবেদনা না দেখিয়ে কর্মী ছাঁটাই করেছে। এখানেই নেতৃত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী অথবা সিইও কিন্তু ঠিকই কর্মীদের কথা আগে চিন্তা করেছেন, তাদের সুরক্ষার প্রতি আন্তরিক ছিলেন। এবং মনে হয় এসব কোম্পানিই ভবিষ্যতে টেকসই হবে।

একজন সিইও বা এমডি একটি জাহাজের নেতা। তাকেই দূরদর্শিতার প্রমাণ দিতে হয়। তাকেই সারাক্ষণ ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। দুঃসময়টিকে ঠিকমতো বোঝা, পরিস্থিতি বুঝে পরিকল্পনা করা, দুঃসময়ে কী করে ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে তার পরিকল্পনা করা, কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা, কর্মীরা যেন তাদের বেতন সময়মতো পান, তারা করোনাক্রান্ত হলে যেন সঠিক চিকিৎসা পেতে পারেন এবং সারাক্ষণ কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা- এসব দিকেই নেতাকে খেয়াল রাখতে হয়।

কর্মীরা তাদের নেতার কাছ থেকে এসব আশা করেন এবং বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ব্যবসায়ী ও সিইও এমন দায়িত্ব পালনের উজ্জ্বল উদাহরণ দেখিয়েছেন। তারা কর্মীদের প্রতি সমবেদনা ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন।

অনেক কোম্পানিকে দেখা গেছে যে তারা এই কঠিন সময়েও কর্মীদের বেতন বাড়িয়ে তাদের আরও বেশি কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। এই নেতারা তাদের ব্যবসা বাঁচাতে সার্থক হয়েছেন। এসব তাদের না করলেও চলত, কিন্তু তারা আগ বাড়িয়ে করেছেন- ভবিষ্যতের জন্য।

আমরা চাই হিতৈষী নেতৃত্ব। আশা করব এই করোনাকালে হিতৈষী নেতৃত্বের যাত্রা শুরু হবে।

গল্পকার; যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত