ভারত-নেপাল সীমান্ত দ্বন্দ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মো. শরীফ হাসান

সীমান্ত নিয়ে কূটনৈতিক-সামরিক উত্তেজনা বেড়েই চলেছে ভারত ও নেপালের। সংকটের শুরু হিমালয়ের পাহাড়ি এলাকায় ভারতের সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে। ভারতের উদ্যোগে লিপুলেখ-কালাপানি এলাকার প্রায় ৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরেই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে কাঠমান্ডু। নেপালের দাবি, বিবাদপূর্ণ দুটি এলাকার মালিকানা তার। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার নতুন মানচিত্রের অনুমোদন দিয়ে পার্লামেন্টে বিল পাস করে নেপাল। যেখানে মানচিত্রে লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা বিস্তীর্ণ এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভারত-নেপালের ঐতিহাসিক বিবাদপূর্ণ অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত দ্বন্দ্ব ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে এবং আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। লিপুলেখ নেপালের সঙ্গে ভারত-চীনের সীমান্তে অবস্থিত একটি কৌশলগত ভূখণ্ড। ভূখণ্ডটি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সুপ্রাচীন যাত্রাপথ; এ ছাড়া ভারত, নেপাল ও তিব্বতের তীর্থযাত্রীদের বহুল ব্যবহূত গমনপথ। ভারত সরকার লিপুলেখ দিয়ে কৈলাস-মানসসরোবর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র ভূমি হিসেবে সুপরিচিত। ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই বিবদমান লকডাউন পরিস্থিতিতেও জনগণ কাঠমান্ডুর রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।
ভারত-নেপাল সম্পর্কের ঐতিহাসিক, সমসাময়িক উন্নয়ন এবং তাদের ভূ-রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক কাজ রয়েছে। এ লেখাটি ভারত-নেপাল সীমান্ত দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তিনটি মৌলিক বাস্তববাদ তত্ত্বকে উন্মোচিত করবে। তত্ত্বগুলো হলো- ক্ষমতা, রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতা ও সার্বভৌম সীমান্ত। প্রথমত, শক্তিশালী রাষ্ট্র/দুর্বল রাষ্ট্রীয় যুগল (বাইনারি) শুরু থেকে যতটা সহজ মনে হয়, ততটা সহজ নয়; এমনকি যখন এটি বিবাদপূর্ণ অঞ্চলের ক্ষেত্রে আসে, তখন দুর্বল/ছোট রাষ্ট্র মালিকানা নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে কোনোরূপ ছাড় দিতে রাজি নয়। দ্বিতীয়ত, নেপাল-ভারত সম্পর্ক স্থিতিশীল নয়, আর এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিশীলতা দুই দেশের জনগণের দ্বারা নির্ধারিত হয়। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ ভারত-নেপাল সম্পর্ককে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। পরিশেষে, ইউরোপকেন্দ্রিক রাষ্ট্রধারণা বলতে যা বোঝায় :রাষ্ট্রের স্থায়ী সীমানা, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও বাইরের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়; পুরো ধারণাটি নিয়ে গুরুতর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
গত ১৮ মে নেপাল সরকার বিতর্কিত কালাপানি অঞ্চলকে তার সীমানায় যুক্ত করে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করেছে। নেপালের এমন কাজের পেছনে চীনের মদদকে দায়ী করেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান মনোজ মুকুন্দন রোভন। ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ভারত ও নেপালের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে নেপাল তার সর্বপশ্চিমে অবস্থিত লিম্পিয়াধুরা থেকে উৎপন্ন কালী নদীর এলাকা তার বলে দাবি করে। বর্তমানে ভারত-নেপাল সীমান্ত বিবাদে শক্তিমত্তা যাচাইকরণ অপর্যাপ্ত এবং অপ্রাসঙ্গিক বটে। ২০১৫ সালে নেপাল যখন ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত, তখন ভারত সরকার নেপালের ওপর পাঁচ মাসের অবরোধ আরোপ করেছিল। আর এই অভূত পরিস্থিতি নেপালের সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে জোট বাঁধতে প্রবল উৎসাহ জুগিয়েছিল। ফলে নেপালে চীনের অবস্থা পাকাপোক্ত হলো। নেপাল চীনের সঙ্গে পরিবহন, যোগাযোগসহ আরও ছয়টি চুক্তি স্বাক্ষরে তারা পরস্পর সম্মত হয়েছিল। বিনিময়ে নেপাল চীনের সাতটি সমুদ্র ও স্থলবন্দরে প্রবেশের অধিকার পেয়েছিল।
একুশ শতকের ভারত-নেপাল সম্পর্ক শুধু ক্ষমতার সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়েছে, কিন্তু জনগণের আবেগ ও অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারত কর্তৃক নেপালের সীমান্ত দখল নেপালের মানুষের সম্মিলিত ক্ষোভে তা প্রতীয়মান হয়। সীমান্ত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ভারত-নেপালের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সক্রিয়তা এত তীব্র হয়েছে যে, নেপাল ও ভারতের হ্যাকাররা একে অপরের ওয়েবসাইটে আক্রমণ করেছে। নেপালে লকডাউনের কড়াকড়ি আরোপের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেপাল সরকারকে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সব নাগরিক সরব হয়েছিল। নেপালের নেতারা ভারতের সঙ্গে দশকের পর দশক সীমান্ত নিয়ে আলোচনা করতে বিরত ছিল এবং তারা তাদের মানচিত্রে কখনোই লিম্পিয়ধুরা-লিপুলেখকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন তথ্য-উপাত্ত, মানচিত্র ও আন্তর্জাতিক নিয়ম-আইনের দ্বারা জনগণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়ে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। জনগণ মূলত ইন্টারনেটে ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এবং ভারতকে আহ্বান জানিয়েছে যে বিশ্বশক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষার আগে ভারতকে প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্বশীল হতে।
আমরা যদি বর্তমানে ভারত-নেপাল সীমান্ত দ্বন্দ্বকে দেখি, তা হলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আমাদের ধারণা পাল্টাবে। দেশের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত মন্টিভিডিও কনভেনশন (১৯৩৩) অনুযায়ী, রাষ্ট্রের চারটি পূর্বশর্ত আছে- জনগণ, ভূখণ্ড, সরকার ও অভ্যন্তরীণ/বাহ্যিক বৈধতা। জনগণের পরিধি সীমান্তের মধ্যে স্থির ও সীমাবদ্ধ। নেপাল ও ভারতের মধ্যে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মগত মিল রয়েছে। ১৯৫০ সালে সংঘটিত ভারত-নেপাল শান্তি এবং বন্ধুত্ব চুক্তি দুই দেশের মধ্যে অবাধ চলাচলের সুযোগ দেয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি সীমান্ত ব্যবস্থার বাস্তববাদিতাকে অগ্রাহ্য করে। প্রায় ১৫ লাখ নেপালি নাগরিক ভারতে কাজ করে, যেখানে নেপালে হাজারো প্রতিবেশী ভারতীয় রাজ্যের লোকের কর্মসংস্থান করে। লিপুলেখ ও কালাপানি অবস্থিত দারচুলা জেলার অর্ধেক জনগোষ্ঠীই চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাদের অনেকেরই জীবিকার সন্ধানে সীমান্তের অপর পাড়ে যেতে হয়। লিপুলেখ ও কালাপানি সংযুক্ত গ্রামগুলোর জনগণ পরিবহন ও যোগাযোগের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতীয় নিরাপত্তাকর্মীরা এই এলাকাগুলোতে অভাবের সময় খাদ্য সরবরাহ করে। যদিও তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্র তার জনগণের সীমান্ত নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে।
শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : প্রতিবেশী