সম্প্রতি সীমান্তে উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে চীন-ভারতের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে ভারতীয় ২০ সেনার মৃত্যু হয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যে এমন সময় দ্বন্দ্ব শুরু হলো যখন করোনা মহামারি সফলভাবে মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে চীন। অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দা ও করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ভারত। চীন ও ভারতের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্বকে তিনটি দিক থেকে বিশ্নেষণ করা যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ দিক : কয়েকদিন আগে ভারতের অন্যতম স্কলার প্রণব মেহতা একটি কলামে ভারতে নেতৃত্ব সংকটের কথা লিখেছেন। চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক মন্দা ও মহামারি ব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষ করলে তার কথার প্রমাণ মেলে। চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়ে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, 'ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটেনি। কেউই আমাদের সীমান্তে ঢুকে পড়েনি। সেখানে এখন কেউ নেই এবং আমাদের নিরাপত্তা চৌকিগুলোও কেউ দখল করেনি।' তার এমন বক্তব্যের পর রাহুল গান্ধী বেশ কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। যদি অনুপ্রবেশ না-ই ঘটে থাকে, তাহলে ভারতীয় সেনারা কেন মারা গেল? তারা কোথায় মারা গেল? তাহলে ভারতীয় সেনারাই কি চীন সীমানায় প্রবেশ করেছিল? অমিত শাহ অবশ্য জাতীয়তাবাদী কথাবার্তা বলছেন। তিনি কোনো বিতর্কে না জড়িয়ে জাতীয় ঐক্য বা চীনবিরোধী মনোভাব তৈরির দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্বটা প্রকাশ্য রূপ নিল এমন সময়ে যখন ভারতে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে এবং করোনা মহামারিতে দেশটি বিপর্যস্ত হচ্ছে। ভারতে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়েছে করোনা মহামারি শুরুর আগে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি ২০১৯ সালে বলেছিলেন, 'ইন্ডিয়ান ইকোনমি ইজ ভেরি ব্যাডলি।' তিনি ভেরি ব্যাডলি শব্দটি ব্যবহার করেছেন তার কারণ হলো- ২০১৬-২০১৭ সালে ভারতের জিডিপি ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৯-২০২০ সালে তা ৫ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। জিডিপি ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের নিচে এসেছিল করোনার আগে। তার মানে সেখানে মন্দার সময়ই এসেছে করোনা মহামারি। এতে দেশটি আরও সংকটে পড়ে। অবশ্য ভারত সরকারের হাতে করোনা মোকাবিলার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় ছিল। কিন্তু মোদি সরকার করোনা মোকাবিলায় অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে। দেশটিতে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিলে গত ২২ মার্চ এক দিনের জনতা কারফিউ জারি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তখনই বোঝা যাচ্ছিল সেখানে পরিকল্পনামাফিক কাজ হচ্ছে না। আমরা জানি যে, দিল্লিতে প্রায় তিন লাখ পথশিশু, পুরো ভারতে এ সংখ্যা ১৮ মিলিয়নের বেশি। এর সঙ্গে ছিন্নমূল বা গৃহহীন পূর্ণবয়স্কদের যোগ করা হলে সংখ্যাটা অনেক বড় হয়। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ লকডাউনে কোথায় যাবে? নরেন্দ্র মোদি প্রস্তুতির সময়টা ভালোভাবে ব্যবহার করেননি, তিনি হয়তো ট্রাম্পের মতো ভেবেছিলেন করোনাভাইরাস চীনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ওই জায়গায় বড় দুর্বলতা ছিল। এর পরে লকডাউনের কারণে দেশটির অর্থনীতির চাকা আটকে গেছে। মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে করোনা বিস্তারে। এমন ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে যে, ভারত ডিসিপ্লিন রাষ্ট্র নয়। তাই ভারতকে চীনের সঙ্গে তুলনা করার প্রশ্নই ওঠে না।

আঞ্চলিক দিক : চীন ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ খুব বেশি অপ্রত্যাশিত ছিল না। গত বছরের আগস্ট মাসে জম্মু-কাশ্মীরের স্ট্যাটাস রদ করার মধ্য দিয়েই মূলত চীনের সঙ্গে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে ভারত। কারণ জম্মু-কাশ্মীরের স্ট্যাটাসের সঙ্গে শুধু পাকিস্তান জড়িত নয়, চীনও জড়িত- বিশেষ করে লাদাখ ও গালওয়ান উপত্যকার জন্য। ওই এলাকাকে প্রথম থেকেই নিজের বলে দাবি করে আসছে চীন। ওই এলাকা মূলত বিরোধপূর্ণ। জম্মু ও কাশ্মীরের স্ট্যাটাস বাতিল করা হলে ওই বিরোধপূর্ণ এলাকা ভারতের বর্ডারে পার্মানেন্ট হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই চীন এটা মেনে নেয়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারত-নেপাল সীমান্তের উত্তেজনা। গত ১৮ মে নেপাল সরকার নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করেছে। মানচিত্রে বিতর্কিত লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা বিস্তীর্ণ এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারও আগে ভারত সরকার ওই এলাকায় ৮০ কি.মি. রাস্তা তৈরি করে, গত মে মাসে উদ্বোধন করা হয় রাস্তাটি। নেপাল প্রথম থেকেই রাস্তা নির্মাণে বাধা দিয়ে আসছিল। কারণ ওই রাস্তার একটি অংশ বিবাদপূর্ণ এলাকার দিকে যাচ্ছিল। এ ঘটনা চীনকে আরও সজাগ করেছে। ফলে নেপালও কিছুটা সাহস পেয়েছে।

বৈশ্বিক দিক : চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই দ্বন্দ্বকে ক্রমেই বড় করছেন। আমরা জানি, মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের একটি সম্পর্ক রয়েছে। আমেরিকায় মহামারি থামানোর ব্যাপারে ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমালোচনা আছে। ট্রাম্প আগামী নির্বাচনে জিতবেন কিনা তা নিয়ে তার নিজের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্ণবাদ। সব মিলিয়ে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই অভ্যন্তরীণ সমর্থন বৃদ্ধিতে চীনের ব্যাপারে নেওয়া নিজের সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি অবশ্যই চাইবেন তার সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে আরও কিছু দেশের একাত্মতা আসুক। সেক্ষেত্রে চীনের প্রতিবেশী ভারত হলে তা ট্রাম্পের জন্য সুবিধাই হয়। করোনা মহামারির পর কী হবে- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়? কোন দেশ প্রথমে ঘুরে দাঁড়াবে, কোন দেশ সবচেয়ে কম ক্ষতি নিয়ে অর্থনীতি সচল করতে পারবে, এগুলোই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো সন্দেহে নেই সেদিক থেকে চীন এগিয়ে আছে। চীনের উহানে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হলেও তারা ঠিকভাবে তা সামাল দিয়ে অর্থনীতি চালু করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভারতসহ অনেক দেশই তা পারছে না। এমতাবস্থায় চীন তার স্বার্থেই ভারতকে চাপে রাখতে চাইছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই দ্বন্দ্ব থেকে ভারত সরকার কী পেল? এই দ্বন্দ্ব নিয়ে ভারতের মধ্যেই একধরনের সমালোচনা শুরু হয়েছে। হয়তো এই দ্বন্দ্বের ফলে জনগণের দৃষ্টি করোনা মহামারি ও অর্থনৈতিক মন্দা থেকে সরে উগ্র জাতীয়তাবাদের দিকে চলে গেল। নরেন্দ্র মোদি হয়তো তার সমর্থন বাড়াতে এই দ্বন্দ্বের আশ্রয় নিয়েছেন। তবে এ কৌশল কাজে দেবে কিনা তা বলা মুশকিল, কারণ এখনও নির্বাচনের অনেক দিন বাকি। ২০১৯ ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘটিত পুলওয়ামা হামলাকে ভালো কাজে লাগিয়েছিল বিজেপি। ওই হামলাকে কেন্দ্র করে দলটি যে রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা নির্বাচনে বড় ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। মোদি সরকার দ্রুতই দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত আলোচনার যে অগ্রগতি হয়েছে তাতে বোঝা যায় দ্বন্দ্ব আর বাড়বে না। আমরা জানি, বিবদমান দুই দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিরাজমান। বাংলাদেশের নীতি হলো- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরী নয়। সেই জায়গা থেকে আমরা চাইব ভারত-চীন কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে দ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধান করুক।

অধ্যাপক; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য করুন