সমকালীন প্রসঙ্গ

মানব পাচার আইনের প্রয়োগ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০     আপডেট: ৩০ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মো. জাকির হোসাইন

বাংলাদেশ মানব পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ছয়-সাত লাখ মানুষকে পাচার করা হয়। এর মধ্যে নারী ও শিশু প্রায় ৭৫%। বিষয়টি নিয়ে এত কথা হলেও, দেশে মানব পাচারের মামলার বিচার ও শাস্তির অবস্থা খুবই খারাপ। অথচ ২০১২ সালে বাংলাদেশের অন্যতম একটি সেরা আইন হিসেবে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ কার্যকর করা হয়। এ আইনটি একটি অতি কার্যকর এবং ভিকটিমের স্বার্থ রক্ষাকারী আইন হিসেবে আইনজ্ঞদের নিকট পরিচিত।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ অনুযায়ী, যে কোনো ভিকটিম বা অন্য কোনো ব্যক্তি মানব পাচারের বিষয়ে থানায় এবং ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করতে পারবেন। এই আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল হিসেবে প্রতিটি জেলায় এক বা একাধিক দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারকের সমন্বয়ে সরকার ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পূর্ব পর্যন্ত সংশ্নিষ্ট জেলার বা অধিক্ষেত্রের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে থাকবেন।

২০১২ সালে এই আইন কার্যকর করা হলেও ২০২০ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ গত আট বছরে কোনো ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। গত ৩ মার্চ আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুর বিভাগীয় জেলা ও মহানগরের জন্য সাতটি ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইতোমধ্যে গত ৮ মার্চ জেলা জজ পদমর্যাদার সাতজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। দেশে বর্তমানে ১০১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের অধীন প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার মামলার কার্যক্রম চলমান আছে। যেহেতু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা অত্যধিক, তাই স্বাভাবিকভাবে ওই ট্রাইব্যুনালগুলো মানব পাচার মামলায় অধিকতর মনোযোগ দিতে পারেন না। গত ১০ জুন দৈনিক সমকাল পত্রিকার তথ্যমতে, দেশে ছয় হাজার ১৩৪টি মানব পাচার মামলা রুজু হয়। এর মধ্যে ২৩৩টি মামলার বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তি হয়েছে ও পাঁচ হাজার ৯০১টি মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান। শুধু ৩৩টি মামলায় ৫৪ জন আসামির সাজা হয়েছে।

গত ১০ জুন বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার চারটি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আসামিপক্ষ প্রভাবশালী হওয়া ও ভিকটিমকে মামলায় আপস করতে বাধ্য করা, মানব পাচার আইন ২০১২ সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা না থাকা, পৃথক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা না করা এবং চলমান মামলার কার্যক্রমের বিষয়ে কোনো মনিটরিং সেল ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয় না থাকা উল্লেখযোগ্য। বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য সারাদেশের যেসব জেলায় মানব পাচার মামলার হার অধিক সেখানে অনতিবিলম্বে পৃথক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হলেই বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। উদাহরণ হিসেবে কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে ৬৪২টি মামলা চলমান থাকলেও সেখানে কোনো পৃথক ট্রাইব্যুনাল নেই। এ ছাড়া যশোর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মানব পাচার মামলার পরিমাণ অনেক বেশি হলেও সেখানে পৃথক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

এই আইনের কয়েকটি দিক খুবই উল্লেখযোগ্য এবং বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ও সাক্ষ্য আইনের ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক সূচনা। আইনে ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়ে বিস্তৃত বিধান আছে ও ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়ে আদালতের সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করে আইন নির্ধারিত যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন। এ আইনটি প্রগতিশীল ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের হাতিয়ার হিসেবে ভিকটিম ও সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ট্রাইব্যুনাল যদি মনে করেন, তবে ভিকটিম ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য ইলেকট্রনিক ও ডিজিটালের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারবেন এবং ক্যামেরা ট্রায়ালের (রুদ্ধকক্ষ) পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন।

ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তার স্বার্থে মামলা চলাকালীন যে কোনো সময় ট্রাইব্যুনাল যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে পুলিশকে নির্দেশ দিতে পারবেন। ওই আইনের ৩০ ধারা মোতাবেক অডিও, ভিডিও বা ইলেকট্রনিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারণকৃত কোনো প্রমাণ সাক্ষ্য হিসেবে ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হবে। মানব পাচার মামলার বিচার চলাকালে ভিকটিম বা বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসামির যে কোনো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ ট্রাইব্যুনাল দিতে পারবেন। এ ছাড়া মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত অর্থদণ্ড ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভিকটিমকে প্রদানের নির্দেশ দিতে পারবেন। যদি ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, ভিকটিমের আরও অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত, সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারবেন এবং রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে ওই অর্থ আসামির কাছ থেকে আদায়পূর্বক ভিকটিমকে প্রদান করবে।

এই আইনকে কার্যকর করার লক্ষ্যে আইনের ১৯ ধারা মোতাবেক মানব পাচার মামলার সমন্বয় ও তদন্তের তদারকি করার উদ্দেশ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ আছে। এ ছাড়া ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি মানব পাচার প্রতিরোধ তহবিল গঠনের বিষয়ের নির্দেশনা আছে। মানব পাচার সংক্রান্ত তথ্যাদি প্রদানের উদ্দেশ্যে তথ্য ভান্ডার সংরক্ষণের নির্দেশনা আইনের ৩৪ ধারায় আছে। এ ছাড়া আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধের ক্ষেত্রে ১৯৭৪ সালে এক্সট্রাডিশন আইন ও সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের চুক্তির প্রয়োগের বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ফেনী