প্রতিবেশী

চীন-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০     আপডেট: ৩০ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. তারেক শামসুর রেহমান

গত ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় (লাদাখ) সংঘর্ষ ও ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যুর পর চীন-ভারত সম্পর্ক এখন বহুল আলোচিত। নানাভাবে এখন এই দু'দেশের সম্পর্ক আলোচিত হচ্ছে। এই সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে- একটি 'যুদ্ধ' হবে কিনা, তৃতীয় একটি পক্ষ এই সংঘর্ষ থেকে ফায়দা ওঠাবে কিনা, চীন ও ভারতের মধ্যে যদি 'উত্তেজনা' প্রতিক্রিয়া বয়ে আনে, সীমান্তে উত্তেজনা বজায় রেখে উভয় দেশের ক্ষমতাসীনরা এ থেকে কোনো সুবিধা নেবে কিনা, প্রতিবেশী প্রথম এই নীতিতে ভারত আদৌ সফল হয়েছে কিনা- এ ধরনের প্রশ্ন এখন উচ্চারিত হচ্ছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও গালওয়ান উপত্যকা নিয়ে অতীতে তেমন কোনো বিরোধের খবর আমরা জানি না। এই এলাকার সীমানাও চিহ্নিত নয়। ব্রিটিশরা এ অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার সময় চীনের সঙ্গে ভারতের সীমানা চিহ্নিত করে যায়নি। একধরনের 'স্ট্যাটাস কো' বজায় ছিল এই এলাকায়। এই গালওয়ান ভ্যালির একদিকে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর, অন্যদিকে চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চীন, যা কিনা ভারত তার নিজের এলাকা বলে দাবি করে। এর উত্তরে রয়েছে সিয়াচিম হিমবাহ, যেখানে ১৯৮৪ সালে পাকিস্তান ও ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিল। এই হিমবাহ ভূমি থেকে ৫৪০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত, যার স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অনেক।  সিয়াচিম হিমবাহের ৭০ কিলোমিটার এলাকা ভারতের নিয়ন্ত্রণে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বাল্টিস্তানের সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে সিয়াচিম। সিয়াচিম হিমবাহের পাশে অবস্থিত একটি এলাকা পাকিস্তান চুক্তি করে চীনকে দিয়ে দিয়েছিল। ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষ হলেও এই অঞ্চলের (পশ্চিম অংশ) অর্থাৎ লাদাখ ও আকসাই চীনের কর্তৃত্ব নিয়ে ১৯৬২ সালে ভারত ও চীন বহুল আলোচিত যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৭ সালেও সংঘর্ষ হয়েছে সিকিমের নাথুলা ও চোলা গিরিপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ১৯৯৯ সালে কারগিল (লাদাখ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত) যুদ্ধের খবর আমরা জানি। আর ২০১৭ সালে দোকলামে ভারত-চীন একটি যুদ্ধের আশঙ্কা জন্ম দিলেও শেষ পর্যন্ত তা অবশ্য হয়নি। এর অর্থ হচ্ছে হিমালয় অঞ্চলে (পশ্চিম অংশ, মধ্যম অংশ, পূর্ব অংশ) যুদ্ধ আর সংঘর্ষের ইতিহাস অনেক পুরোনো।

চীন এ এলাকাজুড়ে সড়কপথ নির্মাণ করছে। একইভাবে ভারতও করছে (লাদাখের রাজধানী লেহ থেকে দৌলতবেগ আলভি সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত)। গালওয়াতে সংঘর্ষের জন্ম এ কারণেই। প্রশ্ন হচ্ছে- এ অঞ্চলে যদি উত্তেজনা থাকে, তাহলে লাভ কার? টনি কার্টাসুচ্চি ইঙ্গিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কথা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা জানে এই অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির অংশ। যুক্তরাষ্ট্র একধরনের 'কনটেইনমেন্ট পলিসি' নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ চীনকে ঘিরে ফেলা! এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে চীনকে ভেঙে ফেলা। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এই নীতি অবলম্বন করেছিল। এবং ১৯৯১ সালে এসে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে কর্তৃত্ব করছে। কিন্তু সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চীনের উত্থান মার্কিন একক কর্তৃত্বের প্রতি একধরনের চ্যালেঞ্জ। তাই চীনকে চাপে রাখা, চীনকে ঘিরে ফেলার একটি স্ট্র্যাটেজি যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। অনেকেই 'কোয়াড'-এর কথা স্মরণ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতকে নিয়ে এটি গঠিত। বেশ ক'বছর ধরে কোয়াড ভারত মহাসাগরে নৌ-সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়ে আসছে। এই জোট চীনের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে একটি পক্ষ হিসেবে কাজ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আরও দুটি সামরিক কার্যক্রমের কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি। ভারত অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তি করেছে। এই চুক্তিবলে প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহিনী ভারতীয় বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ভারতের এমন ধরনের চুক্তি রয়েছে। এ ধরনের চুক্তি নিঃসন্দেহে চীনের জন্য একটি হুমকি হিসেবে চীন দেখছে। চীন যখন গালওয়া উপত্যকা নিয়ে ভারতের সঙ্গে একধরনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে, তখন গত ২১ জুন চীনের সরকারি মুখপত্র গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি সংঘর্ষের ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের আওতায় রয়েছে ৩,৭৫,০০০ সদস্যের বিশাল বহর এবং আরও ৮৫০০০ সদস্য রয়েছে- যাদের প্রয়োজনে নিয়োজিত করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ৬০ ভাগ যুদ্ধজাহাজ এ অঞ্চলে টহল কাজে নিয়োজিত। মোট মেরিন সদস্যের তিন ভাগের দু'ভাগ এ অঞ্চলে কর্মরত। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীন তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু এই এলাকার স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব থাকায় যুক্তরাষ্ট্র চীনের কর্তৃত্ব মানছে না। হংকং পরিস্থিতি, তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি, কভিড-১৯, বাণিজ্যযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে গালওয়া উপত্যকায় চীন-ভারত সংঘর্ষের পেছনে ভারতকে উস্কে দেওয়ার ব্যাপারে পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ইন্ধন থাকতে পারে।

সরাসরিভাবে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ইন্ধন নেই এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি মধ্যস্থতার সংবাদও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভারত ও চীন উভয়ই উঠতি শক্তি। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুটি দেশই ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের 'ডিপ স্টেট' চাইবে না চীন ও ভারত একত্রিত হয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক। এদের মাঝে যদি বিরোধ থাকে তাহলে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্রই। অনেক দিন ধরেই 'চিন্ডিয়া'-এর একটি ধারণার কথা কোনো কোনো মহল থেকে শোনা যাচ্ছে। চিন্ডিয়া অর্থ হচ্ছে চীন এবং ভারত। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন দেশ দুটির মধ্যে বৈরিতা থাকলেও চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-এর ১৯৫৪ সালে ভারত সফরের সময় দেশ দুটি 'পঞ্চশীলা' চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে জন্ম দিয়েছিল জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের। চীন-ভারতের 'পঞ্চশীলা' নীতিকে (পাঁচটি নীতি) কেন্দ্র করে ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বাংদুংয়ে আফ্রো-এশিয়ার দেশগুলোর নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চিন্ডিয়া ধারনা এভাবেই বিকশিত হয়। ভারতের রাজনীতিবিদ (কংগ্রেস) ও সাবেক পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রামেশও চিন্ডিয়ার ধারণা প্রমোট করেছেন (ইকোনমিক টাইমস, ২৭ মার্চ, ২০১৪)। সমসাময়িককালের একজন বহুল আলোচিত জিওস্ট্র্যাটেজিস্ট রবার্ট ডি. কাপলানও তার লেখনীতে (বিখ্যাত গ্রন্থ মনসুন) সম্ভাব্য চীন-ভারত আঁতাতের কথা উল্লেখ করেছিলেন। চীন ও ভারত যদি এক মঞ্চে কাজ করতে পারে, তাহলে বদলে দিতে পারে বিশ্বকে। ভারত ও চীনের মোট এলাকার পরিমাণ ১,২৯,২৮০৬১ বর্গ কিলোমিটার। বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের এক ভাগ (২৭১ কোটি) এই দুই দেশে বসবাস করে। দুটি দেশের মোট জিডিপির পরিমাণ (পিপিপি) ৩৫ দশমিক ৬২৪ ট্রিলিয়ন ডলার (সাধারণ নিয়মে ১৬ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার)। অর্থনীতিতে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ২০১৬ সালে বিশ্বে চীনের অবস্থান ছিল এক নম্বরে (সাধারণ হিসাবে ২ নম্বরে)। ২০৫০ সালে জিডিপির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তাতেও চীন থাকবে এক নম্বরে (পিপিপি)। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল ২ নম্বরে (পিপিপি ২০১৫), তা নেমে আসবে (২০৫০) ৩ নম্বরে। আর ভারত অবস্থান করবে ২ নম্বরে। ফলে চীন ও ভারত যদি একত্রিত হয়, তাহলে বদলে দেবে বিশ্বকে। চীনকে এখন বলা হয় 'উৎপাদনের কারখানা'- অর্থাৎ সব পণ্যই চীন উৎপাদন করে ও সস্তায় তা বিশ্বের সর্বত্র পৌঁছে দেয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও চীনের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড'-এর মাধ্যমে চীন ৬১ দেশকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে সার্ভিস সেক্টর ও ইনফরমেশন টেকনোলজিতে ভারত বিশ্বে একটি অবস্থান তৈরি করেছে। দেশ দুটি বিশ্বব্যংকের বিকল্প হিসেবে ব্রিকস ব্যাংক (২০১৪) প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশ দুটি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সদস্য (২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত)। ফলে নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা বিকাশে এই দেশ দুটি একত্রিত হয়ে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে তা বলাই বাহুল্য। তবে গালওয়ার ঘটনাবলি দু'দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অবস্থা সৃষ্টি করল কিনা- সেটিই এখন দেখার বিষয়। ১৫ জুনের ঘটনাবলির পর বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষের খবর আমরা পাইনি। নীতিগতভাবে দু'দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিজ নিজ দেশের সেনাবাহিনী আগের অবস্থানে ফিরে যেতে সম্মত হলেও তা কার্যকর হয়নি। গালওয়ান উপত্যকায় কার্যত চীনা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারত তা আদৌ মানবে কিনা সেটিই বড় প্রশ্ন। ভারত ও চীন করোনাভাইরাস কভিড-১৯ নিয়ে বিপর্যস্ত। এমনই এক পরিস্থিতিতে হিমালয় অঞ্চলে উত্তেজনা বজায় থাকা কারও জন্যই মঙ্গল নয়।

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
tsrahmanbd@yahoo.com