দুর্যোগ

করোনা মোকাবিলায় টেকসই কৃষি

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০     আপডেট: ৩০ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মইনুল ইসলাম

চলমান করোনাভাইরাস মহামারি জাতিকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দেশের জনগণকে মহামারির প্রতিরোধ যুদ্ধ চলাকালীন খাদ্যাভাব থেকে বাঁচাতে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে কৃষি খাতের সাফল্য। বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক দশক ধরে একটি বিপ্লব চলছে বলা হয়। জনসংখ্যার অত্যধিক ঘনত্ব, জমি-জন অনুপাতের অত্যল্পতা এবং চাষযোগ্য জমির ক্রম-সংকোচন সত্ত্বেও বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করে এখন ধান-উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন ছিল মাত্র এক কোটি দশ লাখ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা সোয়া তিন গুণেরও বেশি বেড়ে তিন কোটি বাষট্টি লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। ধান, গম ও ভুট্টা মিলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল চার কোটি তেরো লাখ টন। সত্তর লাখ টন আলুর অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এক কোটি পাঁচ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। (এখনও আমরা অবশ্য প্রায় ৫০-৫৫ লাখ টন গম আমদানি করি।) মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়াকে হটিয়ে এখন বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। তরিতরকারি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। তরিতরকারি এবং হাঁস-মুরগির মাংস ও ডিম উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। গবাদি পশুর মাংস উৎপাদনে দেশ এখন চাহিদার প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ মেটাতে পারছে, ভারতের গরু চোরাচালান অনেক কমে গেছে। অবশ্য বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে দুধ উৎপাদনে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে মসলাপাতি, ভোজ্যতেল, ডাল ও ফল আমদানির জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে প্রতিবছর। তবুও বলা যায়, কৃষি খাতে সাফল্যের ধারা প্রশংসনীয়। এবারের মহামারির সময়েও বোরো ধানের বাম্পার ফলন জাতিকে পরম স্বস্তি দিয়েছে।

আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, দেশের কৃষি ব্যবস্থা স্বাধীনতা-উত্তর ৪৯ বছরে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকীকরণ, প্রান্তিকীকরণ এবং নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেকখানি রূপান্তরিত হয়ে গেছে। প্রধান প্রধান প্রক্রিয়া হলো- ক. জমির মালিকানা ও কৃষি-জোতের ক্রমহ্রাসমান সাইজ, খ. জমির সাইজের প্রান্তিকীকরণ ও ভূমিহীন গ্রামীণ পরিবারের অনুপাত বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ (৮২ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার এখন ভূমিহীন), গ. ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শহুরে অনুপস্থিত ভূমি মালিক পেশাজীবী ও প্রবাসী মালিকদের কাছে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে জমির মালিকানার হস্তান্তর ও পুঞ্জীভবন এবং এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ভূমি মালিকদের ভূমিহীন কৃষক, বর্গাদার ও ক্ষেতমজুরে পরিণত হওয়ার হার বৃদ্ধি, ঘ. বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমির মালিকানার খণ্ডিতকরণ ও প্রান্তিকীকরণ, ঙ. মাঝারি ও ছোট ভূমি মালিক-কৃষকের সংখ্যা ও অনুপাতের দ্রুত হ্রাস এবং এর ফলে বর্গাদারি ও ভাগচাষের ব্যাপক অনুপাত বৃদ্ধি, চ. একই জোতে অন্তর্ভুক্ত জমির খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বিচ্ছিন্ন অবস্থানে ছড়িয়ে থাকা এবং এর ফলে চাষের প্লটের সাইজ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হওয়ার প্রবণতা, ছ. ভূমিস্বত্ব ব্যবস্থায় বর্গাদারি ও ইজারাদারির দ্রুত প্রবৃদ্ধি, যেখানে ক্ষুদ্র ভূমি মালিক-কৃষক কর্তৃক নিজেদের মালিকানাধীন জমির সঙ্গে অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের জমি বর্গা নিয়ে চাষের জোতকে 'অর্থনৈতিক জোতে' পরিণত করার প্রবণতাই প্রধানত ক্রিয়াশীল, জ. কৃষিজাত পণ্য বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের অব্যাহত আধিপত্য, ঝ. কৃষি-উপকরণ জোগান ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বাজারীকরণ, ঞ. প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের ঋণগ্রস্ততা সমস্যা ও মহাজনি ঋণের অব্যাহত দাপট, ট. কৃষিতে মৌসুমি বেকারত্ব ও ছদ্ম বেকারত্ব সমস্যার অব্যাহত প্রাদুর্ভাব, ঠ. প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ফসলহানি, ড. ব্যয়বহুল বিয়ে, যৌতুক, বিদেশে অভিবাসন ব্যয় মিটানো এবং গুরুতর অসুস্থতার কারণে জমি বিক্রি ইত্যাদি। ওপরে উল্লিখিত নেতিবাচক প্রক্রিয়াগুলোর বিপরীতে কৃষি খাতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনও সূচিত হয়েছে, যার মধ্যে উচ্চফলনশীল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার, সেচ ব্যবস্থার আওতায় আসায় দেশের অধিকাংশ জমিতে বোরো চাষের সম্প্রসারণ, কৃষি খাতে যথাযথ ভর্তুকি প্রদান, কৃষিঋণ পদ্ধতির সহজীকরণ, ফসলের বহুধাকরণ, কৃষির লাগসই যান্ত্রিকীকরণ, উচ্চফলনশীল ফসল, তরিতরকারি, মাছ, হাঁস-মুরগি ও ফলমূল চাষের ব্যাপক প্রচলন, আধুনিক রাসায়নিক সার, বীজ ও কীটনাশকের সহজলভ্যতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ফলে কৃষি ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রবণতাগুলোকে ছাপিয়ে উৎপাদনশীলতার উল্লল্ফম্ফন দেশে একটি কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেছে।


দেশের জিডিপির মাত্র ১৪ শতাংশ এখন কৃষি খাত থেকে এলেও কৃষিতে এখনও দেশের ৪১ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ কর্মরত। কিন্তু জিডিপিতে অবদান সংকুচিত হচ্ছে দেখে দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্বও অতখানি সংকুচিত হয়ে গেছে মনে করা হলে বড়সড় ভুল হবে। বরং বাংলাদেশ থেকে যে এক কোটি বিশ লাখ অভিবাসী বিশ্বের নানা দেশে কর্মরত রয়েছেন, তারা প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রতি বছর যে ১৬-১৭ বিলিয়ন ডলার অর্থ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা চ্যানেলে যে আরও আট-দশ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অনূ্যন ২৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স-প্রবাহ প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ক্ষীণ প্রবাহ সমস্যাকে ভালোভাবে মিটিয়ে চলেছে। এই এক কোটি কুড়ি লাখ অভিবাসীর শতকরা নব্বই জন যেহেতু গ্রামীণ জনপদের অভিবাসী, তাই এই বিশাল রেমিট্যান্স প্রবাহের সুফলের সিংহভাগও গ্রামের অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করে চলেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের দারিদ্র্য দ্রুত নিরসনের অন্যতম বড় কারণ এই রেমিট্যান্স প্রবাহ। রেমিট্যান্স প্রবাহের সুফলভোগী পরিবারগুলোর বর্ধিত ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগে গ্রামীণ অর্থর্নীতিতে বড়সড় সমৃদ্ধির জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে প্রায় আশি লাখ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত চার কোটি মানুষ এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত অবস্থানে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে বলে ধারণা করা যায়। কৃষি খাতের সাফল্যের পেছনেও বাংলাদেশি অভিবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষিতে উচ্চফলনশীল (উফশী) প্রযুক্তির প্রসার, সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, গ্রামীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, আধুনিক স্বাস্থ্য সুবিধা গ্রহণের পারঙ্গমতা বৃদ্ধি, গ্রামীণ জনগণের খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বিপুল অবদান রাখছে। করোনা মহামারির কারণে আগামী এক বছরে কয়েক লাখ প্রবাসী বিদেশে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হলে গ্রামীণ অর্থনীতির এই গতিশীলতা অনেকখানি হারিয়ে যাবে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, করোনা মহামারির ফলে আমাদের অর্থনীতি এখন যে বিপর্যয়ের গিরিখাদে পড়ে গেছে, সেটি পুনরুদ্ধার করতে হলে দেশের কৃষি খাতের সাফল্যকে টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি সংস্কার ও ভূমি সংস্কার এখন জাতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের দাবিদার। এই ইস্যুকে আর বিলম্বিত করা ঠিক হচ্ছে না। আমি মনে করি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের 'অপারেশন বর্গা' এবং কেরালা মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে কৃষি সংস্কার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। আমি নিচের পরিবর্তনগুলোকে কেরালা মডেলের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে অনুকরণীয় মনে করি- ১. কার্যকর রেশন ব্যবস্থা ও ফিডিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে ভর্তুকি দামে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে চাল বিতরণ. ২. ক্ষেতমজুরদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাবিধান এবং নূ্যনতম মজুরি আইন বাস্তবায়ন, ৩. অবসরপ্রাপ্ত ও বর্ষীয়ান কৃষি শ্রমিকদের জন্য পেনশন চালু, ৪. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য বর্ধিত সরকারি চাকরি, ৫. বর্গাদারদের ভূমিস্বত্বের নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের আশঙ্কা নিরসন, ৬. গ্রামীণ ভিটেমাটিতে বসবাসরতদের দখলীস্বত্ব প্রদান, ৭. ভূমিহীন পরিবারগুলোকে বসতবাটির জন্যে প্লট প্রদান, ৮. কৃষি শ্রমিকদের দৈনিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা স্কিম চালু, ৯. গ্রামীণ জনগণের জন্য সরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল নেটওয়ার্কের ব্যাপক সম্প্রসারণ, ১০. কোনো পরিবারকে আট হেক্টরের বেশি জমির মালিকানা রাখতে না দেওয়া, ১১. ভাগচাষি ও বর্গাদার কৃষকদের তাদের চাষকৃত জমির কার্যকর মালিকে পরিণত করা, ১২. কৃষিজাত পণ্যের বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎখাত, ১৩. কৃষিজোতের একত্রীকরণ, এবং ১৪. তৃণমূল জনগণের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের কৃষি সংস্কারের কর্মসূচিতে সম্পৃক্তকরণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়