হলি আর্টিসানের ক্ষত ও শিক্ষা

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

আজ ক্যালেন্ডারের পাতার সেই বিভীষিকাময় তারিখ। সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে আতঙ্কের কাঁটা জাগায়। সেই দুঃসহ রাত ও দিন এত সহজে ভুলে যাওয়ার নয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত প্রায় ৯টা ৫ মিনিট। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গিদের হামলার শুরু। তারপর যা ঘটেছিল তা সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। স্বাধীন বাংলাদেশে ওই রাতের প্রথমভাগ বুলেটের বিকট আওয়াজে কেঁপে উঠেছিল খণ্ডাংশ। কিন্তু এর ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে; এমনকি সীমানা ছাড়িয়েও। সেদিন হলি আর্টিসানে নিজের মতো করেই অনেকে এসেছিলেন। কিন্তু তারা তো জানতেন না পৈশাচিকতা-বর্বরতার নিষ্ঠুর ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত লাশ তাদের আপনজন কিংবা স্বজনের কাছে ফিরে যাবে। সভ্যতা কাঁপানো, মানবতাকে কলঙ্কিত করার জঘন্যতম ঘটনার পর ৪টি বছর কেটে গেলেও কাটেনি সেই বিভীষিকার দুঃসহ স্মৃতি।
গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ৩ বছর ৪ মাস ২৬ দিন পর চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষিত হয় ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের একটি আদালত থেকে। ৮ আসামির মধ্যে ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১ জনকে খালাস দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ঘটনায় জড়িত 'চিহ্নিত' বাকি ১৩ জন বিভিন্ন অভিযানে নিহত হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল চার্জশিট থেকে। সেদিন রাতে ওই বেকারি ও রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশসহ অন্য কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জিম্মি করার পর ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের মধ্যে দেশি-বিদেশি ছিলেন। 'অপারেশন থান্ডারবোল্ট' নামের অভিযানে সেনা, নৌ, র‌্যাব ও পুলিশের বিশেষায়িত টিম সোয়াতের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর ওই অভিযানও দেশ-বিদেশে আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছিল। নিঃসন্দেহে ঘটনাটি ছিল দেশে তৎকালীন চলমান জঙ্গিবাদের ভয়াবহ প্রকাশ।
শান্তিবাদী মানুষ মাত্রেরই প্রত্যাশা ছিল, হলি আর্টিসান মামলার রায় দেশ থেকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। অনস্বীকার্য, এর ইতিবাচক প্রভাব সমাজ-দেশে দৃশ্যমান হলেও একথা স্বস্তির সঙ্গে বলার অবকাশ নেই যে- দেশ থেকে জঙ্গিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়েছে। এখনও নানা আবরণে, নানা নামের সংগঠনের ছায়াতলে জঙ্গি কিংবা উগ্রবাদীদের অপতৎপরতার খবর সংবাদমাধ্যমে আসে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর এত কঠোর অবস্থানের পরও এদের অপতৎপরতা আমাদের সতর্কবার্তাই দেয়। বিগত ৪ বছরে কথিত জঙ্গিরা দেশে বড় কোনো নাশকতার ঘটনা ঘটাতে না পারলেও মাঝেমধ্যে তাদের কর্মকাণ্ড আরও সতর্ক করে দিচ্ছে- এ ব্যাপারে অবহেলা কিংবা উদাসীনতার কোনো অবকাশ নেই। হলি আর্টিসানের ঘটনা স্বাধীন দেশের ইতিহাসে বড় একটি ক্ষত। এ প্রেক্ষাপটে দেশে জঙ্গি কিংবা উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা নির্মূলে নিরন্তর আরও কঠোর অবস্থানের কোনোই বিকল্প নেই।
নজিরবিহীন ওই হামলা দেশে জঙ্গিবাদের বিপজ্জনক বিস্তারের মাত্রা স্পষ্ট করে তুলেছিল। ওই ঘটনা রক্তস্নাত বাংলাদেশের সামনে ফের এই বার্তাই দিয়েছিল- জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে 'শূন্য সহিষ্ণুতা' নীতি কতটা অপরিহার্য। ওই বর্বরোচিত ঘটনার ৪ বছর পরও মনে করি- হলি আর্টিসান হামলার রায় জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ-সন্ত্রাস দমনের স্মারক হয়ে থাকবে। ওই রায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ারও বড় রকমের সহায়ক হয়ে আমাদের সামনে রয়েছে। আমাদের স্মরণে আছে, ওই হামলার দু'দিন পরই শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। এ দুটি হামলার পেছনে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের ছায়া ছিল- একথা এখনও নানা মহলে আলোচনায় উঠে আসে।
আইএসের সম্পৃক্ততা কিংবা নানা সময়ে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে এখনও বহু রকম বক্তব্য শোনা যায়, যা মনে করি অপ্রয়োজনীয়। প্রয়োজনীয় হলো- বাংলাদেশে উগ্রবাদী-জঙ্গিবাদীদের কর্মকাণ্ড কতটা বৃত্তবন্দি করা গেছে সেটি। এর ওপরে নির্ভর করছে জঙ্গিমুক্ত ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। এটি শুধু আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেই জরুরি নয়, দেশের ভাবমূর্তির জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে- বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে জঙ্গি সংগঠন কখনও কখনও দুর্বল হয়ে পড়লেও পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। এই চেষ্টার ছেদ ঘটানোই দায়িত্বশীলদের বড় দায়। এই দায় স্মরণে রেখে সজাগ-সতর্ক থাকার মধ্য দিয়েই এদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।
লেখক ও সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com