শতবর্ষের শ্নাঘা ও সীমাবদ্ধতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মো. আবদুর রহিম

এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষে পদার্পণ করল। ১৯২১ সালের ১ জুলাই উপমহাদেশের প্রচলিত অধিভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা এবং পূর্ববাংলার অধিবাসীদের ভাগ্য পরিবর্তন গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবনায় সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কৃষি, প্রকৌশল, মেডিকেল শিক্ষাসহ পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ ছিল। ১৯৬২ সালে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত প্রকৌশল ও কৃষিশিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই ছিল। মেডিকেল শিক্ষা এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ১৪২টি অধিভুক্ত ও কনস্টিটিউয়েন্স কলেজ এবং ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এমবিবিএস, বিডিএস, বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি, বিএসসি ইন হেলথ টেকনোলজি, বিএসসি নার্সিংসহ বিভিন্ন ধরনের ডিগ্রি প্রদান করে আসছে। বর্তমানে নিজস্ব ক্যাম্পাসে প্রতি শিক্ষাবর্ষে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, যার গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপির সংখ্যা প্রায় সাত লাখ।
পূর্ববাংলার অধিবাসীদের প্রাগ্রসর মানস গঠন এবং সবপর্যায়ের নেতৃত্ব সৃষ্টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অবদান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্ম নেওয়া শিক্ষা-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব পূর্ববাংলায় একটি অধিকার সচেতন এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। এসব গৌরবময় প্রাক্তনদের মধ্যে প্রথমেই যে নামটি আসে তিনি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ ছাড়া বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানসহ মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক ও অর্থ জগতের অসংখ্য নেতৃত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি করেছে। অদ্যাবধি ১৩ জন রাষ্ট্রপতি, সাতজন প্রধানমন্ত্রী, পাঁচজন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, ১১ জন প্রধান বিচারপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন।
পৃথিবীর নামকরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইরা গৌরবের সঙ্গে কাজ করছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এখনও দেশের আকর্ষণীয় সব কর্মক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান সবার ওপরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সহশিক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও অনেক চেষ্টা-তদবির করে বেথুন কলেজের গ্র্যাজুয়েট লীলা নাগ প্রথম শিক্ষাবর্ষেই ভর্তি হন। একই সঙ্গে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্তের মেয়ে সুষমা সেনগুপ্তও সে বছর ভর্তি হন। অনেকটা বিপ্লবী চেতনায় এ প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীর যাত্রা শুরু হয়। অতঃপর ধীর পদক্ষেপে 'জেনানা মহলের' বাসিন্দারা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বেড়াজাল অতিক্রম করে সামনে এগোতে থাকেন। ১৯২৭ সালে নয়জন ছাত্রী এখানে অধ্যয়নরত ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪০০৭ (শতকরা ৩৭ দশমিক ৬০) ছাত্রী অধ্যয়নরত। নারী শিক্ষক প্রায় ৩৩ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীরা ছাত্রদের অতিক্রম করেছেন (প্রায় ৫১ শতাংশ ছাত্রী)। বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে ক্যাম্পাসেও অচিরেই ছাত্রীরা ছাত্রদের সমান হবেন।
শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অগ্রযাত্রা সূচিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকেই। এখানকার ছাত্রীরা প্রথমবার রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ১৯৫২ সালে। পরবর্তী সময়ে সব আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে ট্রেনিং নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মই হয়েছিল পূর্ববাংলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আত্মিক উন্নয়নের জন্য। কৃষক পরিবারের সন্তানরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং অন্যদেরও অধিকার সচেতন হতে সহায়তা করেন। গ্রাম থেকে আগত এসব শিক্ষার্থী নিজেরা রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত হন। পাশাপাশি এ আলোয় অন্যদেরও পথ দেখান। তারা একটি রাজনৈতিক পরম্পরা তৈরি করতে সক্ষম হন। এ ছাড়া পুরো পাকিস্তান শাসনামল জুড়ে সব শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, '৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, '৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধে ১৮ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট ১৯৪ জন শহীদ হওয়ার তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। অনেক শহীদের তথ্য অজানা রয়ে গেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে সব স্বৈরাচারবিরোধী ও মানবতার মুক্তি আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সূদুরপ্রসারী।
আমাদের অনেক আত্মতৃপ্তি রয়েছে। অনেক কিছু করতে না পারার অপূর্ণতাও রয়েছে। শতবর্ষ আগে প্রায় ছয়শ' একরের ক্যাম্পাস, ৬০ শিক্ষক আর ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ ক্যাম্পাসের আয়তন কমে আড়াইশ' একরে ঠেকেছে, শিক্ষার্থী সংখ্যা অর্ধলক্ষ ছুঁই ছুঁই। অন্যান্য পরিসংখ্যান অনুমেয়। শিক্ষার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন আমাদের ব্যথিত করে। বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী টানার মতো বাস্তবতা অনুপস্থিত। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি টাকা মাত্র। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন অধ্যাপকের চেয়ে বেশি গবেষণায় খরচ করে। শিক্ষকদের গবেষণামুখী পরিবেশের অনুপস্থিতি, জ্ঞান-নির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে চাকরি-নির্ভর শিক্ষায় আচ্ছন্নতা, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি উচ্চশিক্ষার মৌলিক দর্শনের পরিপন্থি। যন্ত্রযান আর অপ্রত্যাশিতদের অবাধ প্রবেশ বিদ্যাশিক্ষার নির্মল ও স্বাতন্ত্র্য পরিবেশকে করেছে বিঘ্নিত। জ্ঞানের রাজ্যে ধ্যানমগ্নতার নীরব পরিবেশ কোথায়? ব্রিটিশদের রচিত রমনার সবুজ চিত্রপটে জ্ঞানের উজ্জ্বল আবির আজ খানিকটা ম্লান। ব্রিটিশরা 'রয়েল কমপেনসেশন' হিসেবে রাজকীয় আদলে বিশাল পরিসরে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার আয়তন দিন দিন সংকুচিত হলেও ধারণ করতে হয়েছে সক্ষমতার বেশি।
শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক দিয়েছে। জ্ঞান দিয়েছে, প্রজ্ঞা দিয়েছে, দিয়েছে 'দর্শন চিনিবারে আপনায়'। সাহস দিয়েছে, প্রত্যয় দিয়েছে। এমনকি যখন প্রয়োজন হয়েছে তার সহায়-সম্বলটুকুও দিয়েছে। আজ সত্যিই সময় এসেছে পরবর্তী একশ' বছরের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রাণের এ বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছু দেওয়ার।
mrahimdu77@gmail.com
সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়