চীনের ভুল হিসাবনিকাশ

এশিয়া

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জেনারেল বিক্রম সিং

এশিয়ায় আরেকটি শক্তির উত্থান নিয়ে চীন আগে থেকেই অস্বস্তিতে ছিল। জাতিসংঘসহ অন্যান্য বৈশ্বিক মঞ্চে ভারতের বিভিন্ন প্রস্তাবের বিরোধিতা ছাড়াও বেইজিং এই অঞ্চলে নয়াদিল্লির প্রভাব সীমিত রাখতে সবসময় চেষ্টা করে এসেছে। ভারতের প্রভাব যাতে দেশের বাইরে ছড়াতে না পারে, সেজন্য ভারতের নিকটতম ও অদূরবর্তী প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল চীন। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের  সঙ্গে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অন্যদের সঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীরতর করে চলছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এই উদ্দেশ্য সাধনে সহযোগিতা করছে। এ ক্ষেত্রে চীন মুদ্রার দুই পিঠই ব্যবহার করেছে। যেমন অর্থনৈতিক সহযোগিতা, তেমনই অভ্যন্তরীণ প্রভাব বিস্তার করা। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকাসহ অন্যকিছু অঞ্চলে চীন দ্বিধাহীনভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে।
উদীয়মান সব পরাশক্তিই তার ভূ-রাজনৈতিক এলাকায় প্রভাব বাড়ানোর জন্য আগ্রাসী হয়ে থাকে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ অপরিণত। যদিও চীন তার জাতীয় সক্ষমতা সংহত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি লাভ করেছে, কিন্তু সেখানে এখনও বেশকিছু অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেগুলো দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে নির্ঘুম রাত উপহার দিয়ে চলছে। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি, পিপলস লিবারেশন আর্মির নেতৃত্ব ও জাতীয় নৈতিকতা। আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে চীনবিরোধী সেন্টিমেন্ট।
চীনের ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসা অর্থনীতি ব্যাপক কর্মহীনতা সৃষ্টি করেছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি প্রযোজিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবসা সম্প্রসারণ নীতি বেসরকারি খাতে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। দেশটির জিডিপি বা মোট জাতীয় উৎপাদনের ৬৫ ভাগ এবং নতুন কর্মসংস্থানের ৯০ ভাগ আসত বেসরকারি খাত থেকে। এর ওপর তৈরি শিল্পকারখানা স্থানান্তর, ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার কারণে দেশটির কর্মক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ হবে।
২০১২ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণা দিয়েছিলেন, পিপলস লিবারেশন আর্মিকে বৈশ্বিক মানের সেনাবাহিনীতে রূপান্তর করা হবে যাতে করে ২০৪৯ সালে বিশ্বের কেন্দ্রীয়মঞ্চে পৌঁছতে পারে তার দেশ। তখন থেকে এর যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি জবাবদিহি বাড়াতে বহুমাত্রিক সংস্কার সাধন করা হয়েছে। যদিও শি জিনপিং ব্যক্তিগতভাবে এই সংস্কার প্রক্রিয়া দেখভাল করেছেন, তিনি নিজেই পিপলস লিবারেশন আর্মির নেতৃত্বের মান ও লড়াইয়ের ব্যবহারিক সক্ষমতার অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্তুষ্ট নন। দেশটির বেশকিছু থিঙ্কট্যাঙ্ক জোর দিয়ে বলে আসছে এই পর্যায়ে এসে পিপলস লিবারেশন আর্মি অন্যান্য সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছে।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে জাতীয় নৈতিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু দেশটির অনুগত সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক অ্যাক্টিভিজম দিয়ে চীনের জাতীয় নৈতিকতা বোঝা যাবে না। এই দু'পক্ষই ভারতীয় ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমকে মোকাবিলা ছাড়াও চীনা মডেলের শাসন ব্যবস্থা ফেরি এবং শি জিনপিংকে বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু উপরিতলের নিচে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ক্রমেই অসন্তোষ ঘন হয়ে উঠছে। এর পেছনে রয়েছে কর্মহীনতা, রুদ্ধ হতে থাকা নাগরিক অধিকার, সবধরনের ভিন্নমতের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি অবিচার। এমনকি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে খোদ শি জিনপিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণও তলে তলে তীব্র ও বিপজ্জনক অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।
চীনের সামনে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভারতের লাদাখ অঞ্চলে পিপলস লিবারেশন আর্মির অ্যাডভেঞ্চারিজম স্পষ্টতই অসময়োচিত এবং ত্রুটিপূর্ণ ধারণার ভিত্তিতে পরিচালিত। সম্ভবত বেইজিং কখনোই প্রত্যাশা করেনি যে, ভারতের দিক থেকে এমন সুদৃঢ় রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ভারতের সামরিক অবস্থান ও মনোভঙ্গির পাশাপাশি চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতি আঘাত বেইজিংকে আফসোস ও অস্বস্তিতে ফেলবে। 
লাদাখে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের স্বল্পমেয়াদি কৌশল হতে পারে, উপত্যকাটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর 'স্ট্যাটাস কো' বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সামরিক ও কূটনৈতিক বোঝাপড়ার মিশ্রণ ঘটানো। অসামরিক সব উপায় শেষ হয়ে যাওয়ার পরই কেবল শক্তি প্রয়োগের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠা সম্পর্কে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে, সাইবার জগতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পাকিস্তান যাতে কোনো ধরনের অ্যাডভেঞ্চারিজমে না যায়, সেদিকে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। 
ভারতের দিক থেকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল জাতীয় স্বার্থ এবং বাস্তববোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত। লাদাখে চীনা আগ্রাসী ভূমিকা মোকাবিলার উপায়, পদ্ধতি ও পরিণতির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পরিণতির লক্ষ্য হওয়া উচিত চীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন। রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক দিক থেকে। জাতীয় সক্ষমতার সঠিক তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ শক্তি বিবেচনা করে। 
লাদাখ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহের পাশাপাশি ভারতের উচিত চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন ও লড়াই সক্ষমতা বৃদ্ধির দ্রুততম উপায় অবলম্বন করা। ভারতের পার্বত্য যোদ্ধা বাহিনীর পুনর্মূল্যায়ন এবং তার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা সৃষ্টি এখন কৌশলগত অনিবার্যতা। নতুন যেসব যোদ্ধা রেজিমেন্ট গঠিত হচ্ছে, সেখানে পার্বত্য যুদ্ধের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ২০১৪ সালে চীন সফরে গিয়ে আমি পিপলস লিবারেশন আর্মি নেতৃত্বের মধ্যে ভারতের পার্বত্য যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের আভাস দেখেছিলাম। লাদাখে ভারত সেই সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রমাণ দিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সংঘাত-পরবর্তী সমঝোতার বিষয়টি দেখতে হবে শক্তিশালী অবস্থান থেকে।
যেহেতু প্রয়োজনীয় যুদ্ধ সক্ষমতা উন্নয়নে সময় প্রয়োজন হবে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ভারতের উচিত হবে সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে মিলে আঞ্চলিক সামরিক শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। যদিও সেটা করতে হবে যুক্তিপূর্ণভাবে। লাদাখে চীনের বৈরী নকশা কার্যকরভাবে মোকাবিলায় ভারতে গোটা জাতির উচিত হবে তার সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর পেছনে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। এতে করে সামরিক মনোবলের সর্বোচ্চ পর্যায় টেকসইভাবে ধরে রাখা যাবে।
হিন্দুস্তান টাইমস থেকে ভাষান্তরিত
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ

বিষয় : এশিয়া