মেধা, স্বপ্ন ও বিসিএস

তারুণ্য

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. জেবউননেছা

ছোট ভাই বুয়েট পড়ূয়া কেমিকৌশল প্রকৌশলী। তার শ্রেণিবন্ধুদের ৫৯ জনের মধ্যে ২৭ জন বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। সে নিজে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। আর এক ছোট ভাই কৃষিবিদ, সে কৃষকদের জন্য স্বেচ্ছায় সংগঠন গড়ে তুলেছে। এক ভাই জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে, সে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছে। আমার স্বামী সফলতার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। এই ক'জন মানুষ বিসিএসের দিকে ঝোঁকেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগে আমাদের ব্যাচের সহপাঠী ছিল ১২১ জন। এর মধ্যে সাতজন বিসিএস কর্মকর্তা। বাকিরা কেউ শিক্ষকতা, কেউ ব্যাংকিং, কেউ করপোরেট সেক্টরে, কেউ-বা নিজ উদ্যোগে ব্যবসা- বাণিজ্য করছে। প্রশাসনের ছাত্রী হিসেবে বিসিএস নিয়ে আমারও আগ্রহ ছিল। যখন লক্ষ্য করলাম, লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার আলাদা কোনো অবস্থান নেই। তখন নিজের মতো করে গোছাতে শুরু করি। এখন যখন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে যাই, সেখানকার পাঠক্রমে লক্ষ্য করি- লোকপ্রশাসনের অধীত বিদ্যাই বেশিরভাগ সিলেবাসের পাঠক্রম। প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিক্ষা আমি গ্রহণ করব তা যদি বাস্তবায়নের সুযোগ না পাই, তাহলে দেশের জনগণের অর্থে আমি যে লেখাপড়া করেছি, তার পুরোটাই ব্যর্থ। তাহলে সমাধান কী?
বেশ কয়েকদিন ধরে বিসিএস নিয়ে নানারকম তর্ক-বিতর্ক চলছে। কেউ বলছেন বিসিএস পাঠক্রম সংশোধন করতে হবে। কেউ বলছেন প্রশাসন, পুলিশ ক্যাডারে এত ডাক্তার, প্রকৌশলী কেন? লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থী হিসেবে সাধারণজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞদের বিতর্ক নিয়ে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন থেকে শিখেছিলাম এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে ক্যাডার বৈষম্যের অবসান করতে হবে। ২০ বছর আগে যে বিষয়টি নিয়ে অধ্যয়ন করেছি, সেই বিতর্ক আজও চলছে। পঞ্চাশ বছরের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। এখন এ বিষয়ে আলোচনা করার কথা ছিল না। যদিও বেশ কিছু প্রশাসনিক সংস্কার হয়েছে। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশও রয়েছে। একসময় প্রশাসন ক্যাডারে লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য ছিল। এখন সেটিও নেই। প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র ক্যাডারে সবার অসীম আগ্রহ। অন্যদিকে কৃষিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলীরাও প্রশাসনে ঝুঁকছেন। সব মিলিয়ে একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা। এ অবস্থা থেকে শিগগিরই উত্তরণ করা প্রয়োজন।
সামাজিক মাধ্যমে একজন লিখেছেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে এখন জ্ঞানের চর্চা হয় না। হয় বিসিএস জ্ঞানের চর্চা। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিসিএস বিশ্ববিদ্যালয় করা হোক।' সকাল ৭টা থেকে ব্যাগ হাতে তরুণরা লাইব্রেরিতে যাওয়ার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের লক্ষ্য নিরিবিলি পরিবেশে বিসিএস সিলেবাস মুখস্থকরণ। পাস করার পরই বিসিএসে অদম্য আগ্রহের ফলে জীবন থেকে চলে যায় তাদের বেশ ক'টি বছর। অথচ এই তরুণদের কাজে লাগানো যেত বহুভাবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমের পাশাপাশি পরামর্শ প্রদান করি- চাকরির পেছনে না ঘুরে নিজে যেন অন্যকে চাকরি দিতে পারো তেমন করে নিজেকে গড়ে তোলো। জ্ঞানবান এবং সৎ মনের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠাই হোক তোমার মূল লক্ষ্য। বহু মেধাবী শিক্ষার্থী দেশ ছাড়ছে। কেউ মেধার মূল্যায়ন পায়নি সেই কষ্টে। কেউ-বা ভালো সুযোগ পাচ্ছে, তাই চলে যাচ্ছে। এই যে মেধা পাচার হচ্ছে, এর খেসারত একদিন হয়তো আমাদের গুনতে হবে।
শিক্ষাজীবনে 'লোকপ্রশাসন' বিষয়টিকে কলেজে অন্তর্ভুক্তির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। তখন আলোর মুখ দেখিনি বলে পরে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আবেদন করেছি। জানি না আশার আলো দেখতে পাবো কিনা। হাজার হাজার শিক্ষার্থী লোকপ্রশাসনের বিদ্যা গ্রহণ করছে। বাস্তবিকপক্ষে তাদের এই বিষয়টি কলেজে নেই এবং প্রশাসন ক্যাডারেও আলাদাভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা নেই। তাহলে এই স্নাতকধারীরা যাবে কোথায়? এ বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একটি বিসিএস চাকরি একটি জীবনের নিশ্চয়তা। এই ভেবে হয়তো অনেকে স্বপ্ন দেখেন বিসিএস ক্যাডার হবেন। কিন্তু এমন করে কি ভাবার কথা ছিল। একজন বিসিএস ক্যাডার যিনি প্রত্যন্ত গ্রামে থেকে তার পুরো সময়টা নিজের জন্য বিলিয়ে দেন। সারাটা জীবন এক জেলা থেকে আর এক জেলায় সেবা দিতে থাকেন। নিজের পরিবার-পরিজনসহ হয়ে যান যাযাবর। প্রতি পদে পদে পরীক্ষা দিতে থাকেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মেলে পদোন্নতি। সুতরাং দূর থেকে যতটা সুখের মনে হয়, বাস্তবচিত্র কি ততটা সুখের?
প্রকৃতপক্ষে, অধীত বিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়ে যার যার অবস্থানে থাকলে সেই সেক্টরটি ভালো অবস্থানে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। অন্যদিকে, প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও যুগোপযোগী পরিবর্তন দরকার। মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় বিজ্ঞান এবং গণিতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং কৃষিবিদ ভালো করবেন এটা স্বাভাবিক। সুতরাং এক্ষেত্রে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবার অবকাশ নেই। পদ্ধতির মধ্য দিয়েই তারা মেধার পরিচয় দিচ্ছেন। সেটি তো তাদের ভুল নয়। বিশেষায়িত ক্ষেত্রে যারা লেখাপড়া করেছেন, তাদের মর্যাদা উপেক্ষিত হলে তারা তো সাধারণ ক্যাডারে আসবেনই। বাস্তবে সাধারণ ক্যাডারে মাত্রাতিরিক্ত বিশেষায়িত চলে আসার প্রবণতা ভীষণ ভাবনার। এই বিশেষায়িত ডিগ্রিধারীদের নিজ সেক্টরের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে হবে। বিশেষায়িত ডিগ্রিধারীরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের জীবনযাপনের জন্য একজন প্রশাসককে যতটা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। তাদের তাই দেওয়া হলে হয়তো কেউ নিজ সেক্টর থেকে অন্য সেক্টরে যাবেন না।
দেশের শিক্ষিত যুবকদের কাজে লাগানোর পথ বের করতে হবে। যুবকদের আত্ম-কর্মসংস্থানকল্পে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, কারিগরি পর্যায়ে মনোযোগ বাড়ানো, কৃষিতে আগ্রহ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। দেশটি একটি ভবনের মতো। একটি ভবন তৈরি করতে শক্ত গাঁথুনির প্রয়োজন হয়। সেই গাথুঁনিটা যদি মজবুত হয়, তাহলেই সেই ভবনটি সগৌরবে টিকে থাকে অনেক দিন। শিক্ষিত যুবকরা দেশের সম্পদ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে একটি বার্তাই পেয়েছি, তারা খেয়ে-পরে সম্মান নিয়ে, পরিবার নিয়ে সৎভাবে জীবন ধারণ করতে চায়। দেশের জন্য তারা কিছু করতে চায়, দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়। যুবকদের মনের ভাষা পড়ার সক্ষমতা যেদিন তৈরি হবে আমাদের, সেদিন এদেশ হবে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। যুবকদের স্বপ্ন দেখাতে হবে। সাধারণজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ এবং সমাজের সব ক্ষেত্রে সবাইকে নিয়ে দেশটি এগিয়ে যাক এটিই চাওয়া। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবনার মোক্ষম সময় এখনই।

বিষয় : তারুণ্য