করোনায় বিশ্বের মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাভাবিকতার দিকে ফিরছে বিশ্ব। করোনাকালে বদলে গেছে আমাদের দৈনন্দিন জীবন, আচার, ব্যবহার ও খাদ্যাভ্যাস। আমাদের যোগাযোগ, কেনাবেচা, লেনদেন, অফিস-আদালতের কাজ অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী আমরা নতুন নতুন অভ্যাস গড়ে চলেছি। করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে মানুষ একেবারেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। মানুষের ঘরবন্দি দশায় স্থবির হয়ে পড়েছিল জীবন-জীবিকা-অর্থনীতিসহ জাগতিক সব কর্মকাণ্ড। সবার প্রত্যাশা ছিল দ্রুতই কেটে যাবে করোনা। কিন্তু পরিস্থিতির বিচারে এটা অনুমান করা কঠিন যে, ঠিক কত সময় পর বিশ্ব করোনামুক্ত হবে। এমতাবস্থায় করোনাকে বিবেচনায় রেখেই করা হচ্ছে কর্মপরিকল্পনা।

আমরা দেখেছি, করোনার সময়ে এ বছর পবিত্র ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখ আসলেও সেভাবে উদযাপন হয়নি বললেই চলে। ফলে উৎসবকে কেন্দ্র করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; পাশাপাশি ব্যাহত হয়েছে দীর্ঘকালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা। দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ঈদুল আজহা উদযাপন ও কোরবানির পশুর হাট নিয়ে একধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। করোনাকালে যাই হোক না কেন, স্বাস্থ্যবিধি শিথিল করার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ডিজিটাল হাট চালু করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) ও বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে চালু হয়েছে 'ডিজিটাল হাট'। অবশ্য গত বছর থেকেই দেশে অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় শুরু হয়েছে। এবার আরও বেশি সংগঠন বা প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হচ্ছে। 'ডিজিটাল হাট' রাজধানীকেন্দ্রিক হলেও সরকার অনলাইনে পশু কেনাকাটা করতেই উৎসাহিত করছে। এ ছাড়া অন্যান্য শহরেও অনলাইনে পশু ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছে বিভিন্ন সংস্থা বা সংগঠন। আমাদের দেশে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। দেশের প্রান্তিক মানুষেরা অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে খুব বেশি অভ্যস্ত নন। এক্ষেত্রে বড় 'ক্যাম্পেইন' চালানো দরকার। যত বেশি অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় হবে, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তত কমবে। এ ছাড়া অনলাইনে বাজারে প্রতারক চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে- এমন আশঙ্কাও অমূলক নয়। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সজাগ থাকতে হবে। কেবল নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পশু ক্রয় করাই নিরাপদ হবে। এক্ষেত্রে কোনো রকম সন্দেহ বা প্রতারণার ফাঁদ পরিলক্ষিত হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করতে হবে।

সরকার রাজধানীতে পশুর হাট কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রচলিত হাট চালু করার কথা বলছে। এ জন্য গাইডলাইন তৈরি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মহামারিকালে দেশে অনলাইনে কেনাবেচা অনেক বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই রাজধানীতে অনলাইনে পশু ক্রয়-বিক্রয় কঠিন হবে না। তবে রাজধানীর বাইরে পশুর হাটগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা খুব বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কারণ আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে হাট-বাজারে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় পশুর হাট চালু করা আত্মঘাতী হলেও লাখ লাখ খামারি-কৃষকের জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করলে হাট না বসিয়ে উপায় নেই। এর সমাধানই মূলত অনলাইন হাট কেনাবেচা ও প্রচলিত হাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতাদের যেমন ক্রয়-বিক্রয়ের কথা মাথায় রাখতে হবে, তেমনি সংক্রমণ এড়ানোর দিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। হাটে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত রাখতে হবে। 'দল বেঁধে হাটে যাই'- এই রীতি অবশ্যই পরিহার করতে হবে। হাট ইজারাদারদের উদ্যোগে প্রবেশপথে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের মাস্ক পরে হাটে প্রবেশ করার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে হাট শুরুর দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত। আমাদের জেলা শহরগুলোতে করোনা সংক্রমণ খুব বেশি হয়নি। আমরা যেন সুস্থ থেকে ঈদ উদযাপনসহ স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারি। সামান্য উদাসীনতা যেন জীবনের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।
  সাংবাদিক