আবু হেনা মোস্তফা কামাল (কবি-গীতিকার-প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক) এ রকমই বলছিলেন একবার, 'দুলালের হাতের লেখা ছাপার অক্ষরের চেয়েও স্পষ্ট, ঝলমলে।'
রশীদ হায়দারকে 'দুলাল' (ডাকনাম) বলার হেতু আছে বৈকি। আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমাদের সম্বোধনে 'হেনামামা।' কী সুবাদে মামা, কতটা লতায় পাতায়, বলতে অপারগ। বাংলা প্রবাদ মোক্ষম, 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা।' হেনামামার দৃষ্টিশক্তি চশমা ছাড়াই প্রখর, উজ্জ্বল।
বাংলা অক্ষর, তথা টাইপ, ছাপা-বাঁধাইয়ের পরিপাটি ইত্যাকার নিয়ে পরিশ্রমী, প্রায়-পঞ্চাশ বছর আগেই লিখেছেন রশীদ হায়দার। বইয়ের প্রকাশনা কেমন হওয়া জরুরি, অক্ষর-মুদ্রণ থেকে শুরু করে কাগজ এমনকি প্রচারণা, বইয়ের সার্বিক চেহারা কেন পাঠককে আকৃষ্ট করবে, কেন সর্বগ্রাহ্য রুচিশীল হবে, বিস্তারিত আলোচনা ১৯৭৩ সালে, দৈনিক বাংলার 'একুশে ফেব্রুয়ারি' সংখ্যায় লিখেছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আজও। যদিও বইয়ের চেহারাসুরত- সৌষ্টব্য পাল্টেছে বহুলাংশে এখন। তার অর্থ এই নয়, সম্পূর্ণত পরিপকস্ফ।
প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকায় বেশি মাতব্বরি, পাকামো দেখলে কর্তাকুলের অপছন্দ, থোড়াই কেয়ার করেছেন রশীদ। প্রতিষ্ঠানের বহুবিধ ত্যাঁড়ামো, খাসলত, বিধিনিষেধ ভুক্তভোগীর জানা। বুকের পাটা আছে যার, তোয়াক্কা করবেন কেন। রশীদ করেননি। সম্পাদকতার দায় লেখা ছাপানোই নয় শুধু, সমগ্রতার দায়িত্ব মূলেও।
প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকার সম্পাদক প্রতিষ্ঠানের কর্তা, নামেমাত্র। কাজে লবডঙ্কা। সহকারী (সম্পাদক) যিনি, তার কাঁধেই জোয়াল। বাংলা একাডেমির সাহিত্যপত্র উত্তরাধিকার। রশীদ হায়দার সহকারী সম্পাদক। প্রথম সংখ্যায় কবিতা প্রকাশিত করেন আবিদ আজাদের। লাগামছাড়া সমালোচনা। রশীদ নির্বিকার। কৈফিয়ৎ, 'ভালো কবিতা।' অন্য এক সংখ্যায়, আবদুল মান্নান সৈয়দের একটি গল্পগ্রন্থের তীব্র সমালোচনা, লেখক খান মোহাম্মদ ফারাবী (প্রয়াত। ২২ বছর বয়সে)। তুমুল হৈচৈ। এও বাহ্য। জীবনানন্দের কবিতায় মার্কসীয় দিকধারা, রণেশ দাশগুপ্তর বিচার-বিশ্নেষণ, রবীন্দ্রসাহিত্যের 'বিশেষ লেখালেখি' নিয়ে আহমদ শরীফের চাঁছাছোলা আক্রমণ, রবীন্দ্রপ্রেমিককুল মহাক্ষিপ্ত, এতটাই গোম্বা, 'কেন প্রকাশ? দোষ রশীদের।' অম্লানবদনে উত্তর : 'খণ্ডন করুন যুক্তি। ছাপাবো।' মাথা উঁচু রাখাই পৌরুষ।
'একাত্তরের স্মৃতি' বাংলা একাডেমির প্রকাশনা। সম্পাদক রশীদ হায়দার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সংগ্রাম-স্বাধীনতার স্মৃতিকথা, নানা লেখকের। মহামূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল। তৃতীয় খণ্ড প্রকাশে ঝামেলা। বা সাধেন তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক হারুন-উর রশীদ। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। বিএনপি ঘেঁষা। মনমননে বিএনপিরই। মৃত্যু ইতিহাসের। ঘাতক হারুন-উর রশীদই। কিংবা ওঁর মুরব্বিরা। নিমিত্ত তিনি।
রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ 'নানকুর বোধি।' ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত। প্রথম উপন্যাস 'খাঁচায়।' মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কালপর্ব নিয়ে। লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে। লিখেছেন ৩২ ধানমন্ডির পয়লা বাড়িতে। বাড়িটি স্ত্রী ঝরার (আনিসা হায়দার) বড়আপা 'বেগমবু'র। রশীদ হায়দার নাট্যকারও, এই পরিচয় অজানা অনেকেরই। ওঁরই গল্প 'তৈল সংকট।' নাট্যরূপ দিয়েছেন নিজেই। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় মঞ্চস্থ করেছে, অভিনীত মহিলা সমিতি প্রেক্ষাগৃহে। কয়েক সপ্তাহ একনাগাড়ে। জনপ্রিয়।
অনুবাদ করেছেন ফানৎস্‌ কাফকার উপন্যাসের নাট্যরূপ ('ড্যের প্রোসৎস্‌।' কাফকার প্রথম উপন্যাস। নাট্যরূপ আদ্রে জীদ ও জ্য লুই জার) 'কাঠগড়ায়।' রশীদের মৌলিক নাটক আরও একটি 'শেক্সপিয়র দ্য সেকেন্ড' অসম্ভব ভালো নাটক। কবি হাসান হাফিজুর রহমানের বিশ্বাস : 'অনুবাদ হলে সব দেশ লুফে নেবে।' আক্ষেপ এই, বাংলাদেশেই অভিনীত হয়নি। সাহস নেই করার। রশীদ হায়দারের ডাকনাম দুলাল। এই নাম হেনামামা, আবু হেনা মোস্তফা কামাল চালিয়ে দিয়েছেন বাংলা একাডেমির সহকর্মীর বলয়ে, রশীদ ছিলেন একাডেমির উপপরিচালক। অনুজঅনুজার সম্বোধন 'দুলাল' নয়, 'দাদুভাই।' কেন এই ডাক, ইতিহাস নেই।
রশীদ হায়দারের জন্ম ১৫ জুলাই, পাবনার দোহার পাড়ায়। লেখাপড়া পাবনা, ঢাকায়। ছোট চাচা আবুল কাসেম বলতেন, 'দুলালের নানা গুণ। অভিনেতা, গায়ক হতে পারত। নায়ক হওয়ার চেহারা, তা না, লেখক হলো। তোরা সব ভাই কবি, দুলাল গল্প লেখে।' এই আক্ষেপে সংযোজন, 'বাড়িতে একজন লেখক, ছাইপাশ কবিতা লিখিস।'
আনিসা হায়দার-রশীদ হায়দারের দুই কন্যা। হেমা (হেমন্তী হায়দার)। ক্ষমা (শাওনী হায়দার)। দুই কন্যার চার সন্তান। আনিসা হায়দারের ডাকনাম ঝরা। পৈতৃক নাম আনিসা আখতার। বিয়ের পরে 'হায়দার।' গত বছর, ১৯ জুন, পরলোকে।
অসম্ভব ভালোবাসতেন, মায়ায় জড়িয়ে বিয়ে। দু'জনেই একই শহরের। এবাড়ি-ওবাড়ির দূরত্ব তিন কিলোমিটার।
স্ত্রীর মৃত্যুতে রশীদ হায়দার এতটাই দিকশূন্যহীন, মানসিক আঘাতে এখন প্রায়-নির্বাক। এলোমেলো সব কিছু। নিঃসঙ্গতার প্রহারে আপনজনও অচেনা যেন। ঝরা ছিলেন সুখদুঃখে সর্বংসহা। রশীদেরই ছায়া। রশীদের উজ্জীবিত জীবনে।
রঙ্গরসিকতায় রশীদ হায়দার প্রখর, মজাদারও। বলেন : "রবীন্দ্রনাথের 'র', রশীদের 'র'; ৮০ বছর বয়সে ঠাকুর ইহলোক-ত্যাগী। তোদের রবীন্দ্রনাথকে বয়সে টেক্কা দেব।"
আশা পূর্ণ হোক। লেখায় আবার সচল হউন। কথা ফুটুক। দাদুভাই, রশীদ হায়দারকে ৮০ জন্মদিনে, বার্লিন থেকে অনুজের শুভেচ্ছা।
কবি