চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, তারুণ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা

মানবসম্পদ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান

মানুষের উদ্ভাবনী অভিযাত্রায় সাম্প্রতিককালে সংযোজিত হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, রোবটিকস এবং কম্পিউটার ক্লাউডিংয়ের মতো সুপার টেকনোলজি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যন্ত্র যেমন শব্দ শুনে বা ছবি দেখে সুনির্দিষ্ট অবজেক্ট শনাক্ত করতে পারবে, তেমনি পারবে বিভিন্ন বিষয় শিখতে এবং প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সমৃদ্ধ বিভিন্ন যন্ত্র যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করবে, তখন তা পরিণত হবে ইন্টারনেট অব থিংসে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুমাত্রিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিকাশিত হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব।
ইতোপূর্বে ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কারের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় প্রথম শিল্পবিপ্লবের। আবার ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ শক্তির আবিস্কার এবং ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের উদ্ভাবন ও বহুমাত্রিক ব্যবহার মানব সভ্যতাকে পৌঁছে দেয় যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের যুগে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি পর্ব ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। যেখানে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি বহুবিধ উদ্যোগের ফলে দেশে একদিকে যেমন শিক্ষার হার বেড়েছে, অন্যদিকে হ্রাস পেয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের আনুপাতিক ব্যবধান। কিন্তু শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৭ সালের বরাতে বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স (বিবিএস) বলছে, দেশের শ্রমবাজারে প্রতি আটজনে মাত্র একজন প্রাতিষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিত আছেন। মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪ দশমিক ০২ শতাংশ বেকার। আবার তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ।
দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশের নাগরিক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা ৬৪ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে ২০১৬ সালের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বাংলাদেশের ৭০ লাখ নাগরিক বিদেশে কমর্রত আছেন। দক্ষতার ঘাটতির কারণে প্রবাসে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয় অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের চেয়ে কম মন্তব্য করে জনাব মুহিত বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের ৫২ শতাংশ স্বল্প দক্ষ, ১৪ শতাংশ আধা দক্ষ, ৩১ শতাংশ দক্ষ এবং মাত্র ২ শতাংশ পেশাজীবী।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের উপার্জিত রেমিট্যান্স আয় এসেছে প্রায় সাড়ে ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের আরএমজি খাতসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি খাতে টেকনিক্যাল ও ম্যানেজারিয়াল পোস্টে কর্মরত আছেন বেশ কয়েক লাখ বিদেশি নাগরিক। ২০১৬ সালে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে কর্মরত দুই লাখ বিদেশি নাগরিক প্রতি বছর পাঁচ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে নিজ নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ আমাদের কমপক্ষে ৭০-৮০ লাখ মানুষের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের এক-তৃতীয়াংশই নিয়ে যাচ্ছেন মাত্র কয়েক লাখ বিদেশি নাগরিক। আমাদের নিয়োগকর্তারা বলছেন, দেশে যথেষ্ট সংখ্যক যোগ্য কর্মী না থাকায় তারা বিদেশিদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৭ বলছে, বাংলাদেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর ৭৯.৬০ শতাংশ তরুণ এবং বেকার তরুণদের ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। এই অবস্থার মধ্যেই প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার তরুণ অর্জন করছেন স্নাতক ডিগ্রি।
এসব তথ্য দেশে তরুণ জনশক্তির অপর্যাপ্ত এবং অপরিপকস্ফ ব্যবহারের ইঙ্গিত বহন করে। শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৭ বলছে, বাংলাদেশে ইয়ুথ নিট রেট ২৯ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। কারণ রেট একটি দেশের অর্থনীতিতে তারুণ্যের নিষ্ফ্ক্রিয়তার চিত্র তুলে ধরে। আর এসব পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, বাজার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনগোষ্ঠীকে বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় পেশাগত ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানবসম্পদে রূপান্তরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আশানুরূপ সক্ষমতা অর্জিত হয়নি। ফলে জনসংখ্যা কাঠামোয় তারুণ্য স্টম্ফীতির ধারায় বাংলাদেশ প্রায় দুই দশক অতিক্রম করলেও এখনো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বোনাস কালের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেনি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যোগ হয়েছে চলমান বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ এর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুটি উৎস আরএমজি এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আয়কে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কভিড পরিস্থিতিতে দেশের আর্থ-সামাজিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে সচল রাখতে প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ মানব সম্পদের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। এমতাবস্থায়, চলমান অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রযুক্তি বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন, পরিবর্তিত বাস্তবতায় অভিযোজন উপযোগী একটা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থার। এক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যগুলো যেমন সুনির্দিষ্ট হতে হবে, তেমনি সংশ্নিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে খাতওয়ারি প্রয়োজনীয় জনশক্তির মানভিত্তিক চাহিদা নিরূপণেও হতে হবে সতর্ক। আরেকটি বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পূর্ণ বিকাশের প্রকৃত রূপটি কেমন হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাই সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত বিবর্তনের সঙ্গে স্বল্পতর সময়ে খাপ খাইয়ে নিতে আমাদের মৌলিক বিজ্ঞান শিক্ষার গাঁথুনি মজবুত হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতির চিত্র খানিকটা ফুটে ওঠে ২০১৭ সালে গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার মানের ওপর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে। যেখানে পৃথিবীর ১৩৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশর অবস্থান ছিল ১০৭তম। তাই বিদ্যমান বাস্তবতা এবং সম্ভাব্য চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েই কারিকুলামের পুনর্বিন্যাস করতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিকের পর কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বিদ্যমান এবং সম্ভাব্য চাহিদাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিষয় খোলা এবং আসন সংখ্যা নির্ধারণে, দেশি-বিদেশি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হবে গবেষণা জ্ঞানকে।
তবে বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে কোনো রকম পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও শ্রমবাজার সংশ্নিষ্ট অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যভিত্তিক গবেষণার আলোকে। কারণ শিক্ষাব্যবস্থা একটা জাতির প্রাণশক্তির আধার। জাতীয় স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাও বহুলাংশে শিক্ষাব্যবস্থা-নির্ভর। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় সামান্যতম পরিবর্তনেও সর্বোচ্চ সতর্কতার দাবি রাখে।
frkhan62@yahoo.com
সহকারী অধ্যাপক (হিসাববিজ্ঞান), ময়মনসিংহ সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ