করোনায় অন্তঃসত্ত্বা নারী

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

নুসরাত শারমিন

মা হওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলোর মধ্যে একটি। মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করার জন্য একজন নারীকে দীর্ঘ নয়-দশ মাস বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অন্তঃসত্ত্বাকালীন সময়ে হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে নারীর মধ্যে চাপ, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মাত্রা সাধারণত বেশি হয়ে থাকে; কিন্তু বর্তমানে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ডাক্তারদের অফিস সময়ের পরিবর্তন, পরিবর্তিত হাসপাতালের নীতিমালা এবং করোনাভাইরাসে সংক্রমিক হওয়ার আশঙ্কা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এই মানসিক চাপ ও উদ্বেগকে আরও দ্বিগুণ করে তুলেছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর আর মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক।

একটি নির্দিষ্ট মাত্রার মানসিক চাপ ও উদ্বেগ এ সময় স্বাভাবিক; কিন্তু যখন এই চাপ ও উদ্বেগের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি হয়, তখন তা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের লক্ষণ হলো- পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া; ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেওয়া; সবসময় করোনা আক্রান্ত হওয়ার কথা ভেবে ভয় পাওয়া; প্রসবের সময় করোনা পরিস্থিতির জন্য কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা ভেবে দুশ্চিন্তা করা; যে কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা; সংক্রমণের ভয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা; সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে অসহায় ও একাকিত্ববোধ করা ও ডিপ্রেশনে চলে যাওয়া।

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে সুস্থ থাকতে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা কিছু টিপস মেনে চলতে পারেন- দিনের বেশিরভাগ সময় টিভি, রেডিও বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবর দেখা থেকে বিরত থাকা। সংকটের সময়ে ক্রমাগত বেশি তথ্য সন্ধান করা স্বাভাবিক, তবে সেটি কেবল আমাদের মধ্যে উদ্বেগ এবং সংক্রমিত হওয়ার ভয়কে বাড়িয়ে তুলবে। তাই দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়কে নির্ধারণ করুন দৈনন্দিন সংবাদ সম্পর্কে জানতে।

বর্তমানে ডাক্তার ও মেডিকেল পেশায় নিয়োজিত অনেকেই অ্যান্টিন্যাটাল কেয়ারের ওপর অনলাইন কোর্স করিয়ে থাকেন, এ ধরনের কোর্সে যোগদান করা। এমন প্ল্যাটফর্মগুলোতে অন্তঃসত্ত্বা অন্যান্য নারীর সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমে আসে যা সুস্থ থাকতে সহায়তা করে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হলেও মনের যত্ন নিতে ফোন ও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকুন। এ সময় মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্লগ পড়তে পারেন বা এ ধরনের অনলাইন গ্রুপ বা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারেন।

মানসিক চাপ কমাতে ইতিবাচক চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ। করোনাভাইরাস সম্পর্কে শুধু নেতিবাচক চিন্তা না করে ইতিবাচক তথ্যগুলোর প্রতি নজর দেওয়া যেতে পারে, যেমন- সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে যায়। এই ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া মানেই মৃত্যু নয়। লকডাউনের ফলে আমরা এখন পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারছি ইত্যাদি। মানসিক চাপ এড়াতে ও বিরক্তিকর চিন্তাভাবনা কমাতে কারও সঙ্গে কথা বলুন। হতে পারেন তিনি আপনার সঙ্গী, পরিবারে সদস্য বা কোনো বন্ধু। নতুন কোনো শখ বা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। যেমন গান শেখা, বাগান করা, রান্নার অনলাইন কোর্স করা। নতুন কোনো ভাষা শেখা। অনাগত শিশুর জন্য কাঁথা বা জামা সেলাই করা একসময় অনেক ভবিষ্যৎ মায়েরা উপভোগ করে থাকেন। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বার সময়ে কিছু শারীরিক ব্যায়াম, মেডিটেশন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম শরীর ও মনকে ভালো রাখতে সহায়তা করে। তাই দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এর জন্য রাখা। আতঙ্কিত না হয়ে বরং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া শুধু অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্যই নয় বরং সব মানুষের জন্যই জরুরি।

প্রভাষক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ