প্রযুক্তির চোখে

ভূতুড়ে বিল ঠেকাতে ডিজিটাল বিলিং

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ মেহেদী

এই মহামারিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পানি-বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল। একটি সংকটজনক সময়ে ভূতুড়ে বিল সাধারণ মানুষের কাছে একটি বড় আঘাত। সরকারি যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান অস্বচ্ছ এবং অদক্ষ কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের মাধ্যমে খুব সহজে সরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি স্বচ্ছতা এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজকভাবে সেই সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘুরেফিরে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতির মধ্যে রাখা হচ্ছে, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে না।

প্রথমেই ঢাকা ওয়াসার কথা বলি। ঢাকা ওয়াসা রাজধানীতে পানি সরবরাহ করে বলে উদাহরণ হিসেবে আনছি। এটা দেশের অন্যান্য শহরের পানি সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের জন্যও প্রযোজ্য। পানি, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস- এই তিনটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা এবং অব্যবস্থাপনার মধ্যে আছে ঢাকা ওয়াসা। কারণ বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার দিকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোতে থাকলেও এখন পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসা ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ধারেকাছেই আসতে পারেনি। এখন পর্যন্ত সেই বহু বছর আগের 'টেম্পারিং সহায়ক' মিটারের ব্যবহার আর মিটার রিডারদের দৌরাত্ম্যের ব্যবস্থাপনার মধ্যেই পড়ে আছে ওয়াসা। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে বরং মাঝখানে পিপিআইর (প্রোগ্রাম ফর পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট) মতো দুর্নীতি সহায়ক একটি উদ্ভট প্রকল্প নিয়ে অব্যবস্থাপনাকে চরমে নিয়ে গেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। পিপিআইর যারা ঠিকাদার, তারা যত বিল আদায় করবেন, তার ১০ শতাংশ পাবেন- এ ধরনের অনৈতিক চুক্তির মাধ্যমেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাকে নিয়মসিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ যা গণবিরোধী। এই চুক্তির ফলেই পিপিআই ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছামতো গ্রাহকদের জিম্মি করে অতিরিক্তি বিল আদায় করেছে। খুব সহজে মিটার টেম্পারিং করে নিরীহ গ্রাহককে ফাঁদে ফেলেছে। ফলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। অবশ্যই সরকারের উচিত ওয়াসার বর্তমান পিপিআই প্রকল্পের প্রবর্তক ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করা এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। প্রকৃতপক্ষে ঢাকা ওয়াসা ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার সরকারি নীতির বিপরীতে আছে। এখন পর্যন্ত ওয়াসার সর্বোচ্চ ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহককে বিলের হিসাব জানিয়ে দেওয়া!

ওয়াসায় দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার মূল উৎস 'হিউম্যান মিটার রিডার' আর 'ইজি টেম্পারিং ফ্রেন্ডলি মিটার'। এ দুটি উৎসমুখ বন্ধ করতে পারে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং সেটি বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন কিছু নয়। ডিজিটাল যুগে 'হিউম্যান মিটার রিডার'-এর উপস্থিতি একেবারেই বেমানান। এখানে থাকবে একটি ডেডিকেটেড বিলিং সার্ভিস নেটওয়ার্ক, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির মিটার এবং গ্রাহকের কাছে থাকবে একটি অ্যাপ। যার মাধ্যমে গ্রাহক নিজেই দেখবেন তিনি কতটা পানি ব্যবহার করছেন, কতটা ব্যবহারের জন্য কত বিল আসছে এবং তিনি অ্যাপের মাধ্যমেই বিল পরিশোধ করবেন। একটা অনলাইন গ্রাহক সেবাকেন্দ্র থাকবে। যেখানে গ্রাহকরা কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে জানাবেন। কিছু টেকনিশিয়ান থাকবেন যারা কোথাও মিটারে সমস্যা কিংবা এ জাতীয় কারিগরি সমস্যা হলে তা দ্রুত দূর করার ব্যবস্থা করবেন। বাংলাদেশে এমন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আছে যারা ওয়াসার ডিজিটাল বিলিংয়ের জন্য ডিজিটাল মিটার এবং অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করে মাত্র ছয় মাসে তা বাস্তবায়নে নিয়ে আসতে সক্ষম। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান এখন জাপানে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) সেবা দিচ্ছে, আর বাংলাদেশের ওয়াসা পড়ে থাকে মান্ধাতা আমলের ব্যবস্থাপনায়! ওয়াসার ব্যবস্থাপকরা সব সময়ই বলেন, ডিজিটাল বিলিং প্রকল্প নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে! আর কয় প্রজন্ম প্রক্রিয়াধীন থাকবে?

আসলে ঢাকা ওয়াসার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা এবং বিলিং কার্যক্রম পৃথক করে ফেলা দরকার। পুরো বিলিং কার্যক্রমের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেশের কোনো উপযুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া উচিত। এই প্রতিষ্ঠান বিলের কোনো 'শতাংশ' পাবে না। সেবার জন্য নির্ধারিত হারে ফি পাবে। আর ঢাকা ওয়াসার অ্যাকাউন্টে বিলের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে। ঢাকা ওয়াসার খুব ছোট একটি রাজস্ব বিভাগ থাকবে, যারা শুধু জমা হওয়া টাকার হিসাবটা মিলিয়ে দেখবে। এটা হলে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীতে কীভাবে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা যায়, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনে দক্ষ ব্যবস্থাপনা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও কীভাবে গতিশীল করা যায়, আরও কী ধরনের লাভজনক এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্প নেওয়া যায়- সেসব বিষয়ে মনোযোগ দেবে ওয়াসা। হিউম্যান মিটার রিডার আর রাজস্ব কর্মকর্তার আধিক্যের বদলে ওয়াসা হবে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্যবিদ এবং ডিজিটাল সময়ের তরুণ উদ্ভাবকদের কর্মক্ষেত্র।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডেসকো, ডিপিডিসি ডিজিটাল প্রি-পেইড মিটার সীমিত পরিসরে চালু করেছে। কিন্তু ডিজিটাল বিলিং সিস্টেম বলতে যা বোঝায় সেটি হয়নি। আমি ডেসকোর গ্রাহক। এখনও ডেসকোর যে প্রি-পেইড মিটার সেটি দ্বিতীয় প্রজন্মের ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক স্মার্ট প্রযুক্তি নয়। স্মার্ট প্রযুক্তিতে ভেন্ডিং মেশিনের কোনো দরকার নেই। এটা সত্যি- এই দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তিতেই মোবাইল আর্থিক সেবা প্রযুক্তি (এমএফএস) ব্যবহার করে বিল পরিশোধের একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এটাও স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার নয়। স্মার্ট প্রযুক্তিতে গ্রাহক অ্যাপের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তের ব্যবহারের চিত্র দেখতে পাবেন, সেই অনুযায়ী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ কিংবা বাড়াতে পারবেন, টাকা কমে এলে সংকেত পাবেন এবং অ্যাপ থেকেই বিল পরিশোধ করতে পারবেন। বিদ্যুৎ বিভাগ অনেকদিন থেকেই এই স্মার্ট প্রযুক্তি চালুর কথা বলে আসছে, কিন্তু সেটি পাইলটের খোলস ছেড়ে বৃহত্তর পরিসরে গ্রাহকের কাছে আসতে কেন এত সময় লাগছে- সেটিই প্রশ্ন।

গ্যাস সরবরাহ করা কর্তৃপক্ষও ডিজিটাল মিটার চালুর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু বিল পরিশোধে গ্রাহক ভোগান্তি রয়েই গেছে। গ্রাহককে যেতে হচ্ছে সেই নির্ধারিত কিছু ভেন্ডিং মেশিনওয়ালার কাছে কিংবা নির্ধারিত পয়েন্টে। অথচ এখন এমএফএস সেবার মাধ্যমে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করা যায় সহজেই। বিকাশ, রকেট, নগদের মতো জনপ্রিয় এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গ্রাহক বিল পরিশোধের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা এবং চুক্তি করাটা কি খুব জটিল? তার পরও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগকে ধন্যবাদ তারা সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছে, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কথা চিন্তা করেছে। ওয়াসার মতো ডিজিটাল চিন্তাবিরোধী পিপিআই জাতীয় প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির ভিত্তি আরও মজবুত করার উদ্যোগ নেয়নি।

সাংবাদিক