কভিড-১৯ আমাদের জীবনকে এমন নানামুখী নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যা কিনা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে ফেলছে। বাঁচার জন্য আমাদের যে রুটি-রোজগার তা এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। বর্তমানে বিশ্বের পূর্ণ বা খণ্ডকালীন মোট কর্মশক্তির প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পেশা কোনো না কোনোভাবে কভিড-১৯ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ৩০ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশ করেছে। সেখানে উঠে এসেছে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী কর্মঘণ্টা ১৪ শতাংশ কমে গেছে এবং অন্তত ৪০ কোটি মানুষ পূর্ণকালীন চাকরি হারিয়েছে। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রায় ১৬০ কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসেবে বাংলাদেশে অন্তত দেড় কোটি মানুষ চাকরি হারানোর তালিকায় যুক্ত হতে পারে। এখন এই দেড় কোটি মানুষ যদি চাকরি হারায়, তাহলে তাদের পরিবারে গড়ে চারজন করে সদস্য যদি ধরা হয়, তাহলে আরও অন্তত পাঁচ কোটি মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। এ ছাড়া, বিশ্বেও ১৬৯টি দেশে বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ কাজ করে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশেরই কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় সেখানে চাকরিচ্যুতি শুরু হয়েছে। ফলে সেসব দেশে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের প্রায় ৮৯ শতাংশ শ্রমশক্তি নিযুক্ত অনানুষ্ঠানিক খাতে যেমন- হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র কারখানা ইত্যাদিতে। তারা অনেক সময় প্রায় বিনা নোটিশে পাওনা ছাড়াই ছাঁটাই হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য যে বার্ষিক মুনাফা এবং পদোন্নতি তা স্থগিত রেখেছে। করোনার বিরূপ প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর যতটা হানা দিচ্ছে, সেই অনুযায়ী শ্রমবাজারেও এর ভয়াবহতা দেখা দিচ্ছে।
এখন এই যে এত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তা কি শুধুই আর্থিক? মোটেও না। এই লাখ লাখ কর্মীর আয় নেই মানেই তাদের খাবার নেই, নিরাপত্তা নেই আর সেই সঙ্গে নেই ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা। এই মহামারি পারিবারিক আয়ে বিপর্যয় নিয়ে আসায় যিনি উপার্জনকারী ছিলেন তার ভেতরে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হবে যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভীষণভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর ঘরবন্দি হয়ে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় এই সময় এই মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও মারাত্মক আকার নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এমন কেস দেখা গেছে যেখানে ব্যক্তি চাকরি হারিয়ে পরিবারকে ভরণ-পোষণ দিতে না পারায় আত্মহত্যা করেছেন অথবা ব্যক্তি শারীরিক কোনো প্রতিক্রিয়া যেমন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছেন। আবার অনেকে নিজের বা অন্যের ওপর বিধ্বংসী আচরণ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি ব্র্যাক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও জরিপে উঠে এসেছে- দীর্ঘ লকডাউনে নারী নির্যাতনের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এই নির্যাতনের ইতিহাস শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নয়, পেছনে লুকিয়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা চর্চার ধরন ও প্রকৃতি; যেখানে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নারীর ওপর আরও বেশি নিপীড়ন নেমে আসে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্যের এই সংকট সরকারগুলো জরুরি ভিত্তিতে আমলে না নিলে সামনে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে এর 'ব্যাপক বিস্তার' ঘটতে পারে। কিন্তু এই সময়ে সবচেয়ে বড় যে মূলধন মনোবল, তা কীভাবে ধরে রাখা যায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামাল চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন, মনোবলের বিষয়টি ব্যক্তিত্বের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। একজন চা দোকানির ব্যবসা বন্ধ হলে তিনি সবজি বিক্রি করে বিকল্প খুঁজে নিতে পারেন। কিন্তু একজন শিক্ষকের চাকরি চলে গেলে তার জন্য ব্যাপারটা এত সহজ নয়। অনেকে এই সময় আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকেন, হতাশ হয়ে যান। এক্ষেত্রে, পরিবার থেকেই প্রথম সহযোগিতাটা আসতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে- এটা একটি বৈশ্বিক সংকট, তার এখানে কোনো দোষ নেই। এক্ষেত্রে, মনোবল ধরে রাখতে এভাবে চিন্তা করা যায়, আগামী তিন বা ছয় মাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প কিছু করার চেষ্টা করতে থাকি। এ ছাড়া এই পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত সব মানসিক যাতনা ও কষ্ট নিজের কাছে চেপে রাখা যাবে না। পরিবার, বন্ধুদের কাছে বলতে হবে। আর একান্তই কাউকে না বলতে পারলে সেক্ষেত্রে মানসিক শক্তি ও মনের উদ্যম ফিরিয়ে আনার জন্য যে কেউ সাইকোলজিস্টেরও শরণাপন্ন হতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে পরিবারকেই উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। একজন মানুষ যাতে হতাশা কাটিয়ে আবার মনোবল ফিরে পান, অন্ধকার থেকে তাকে হাত ধরে তুলে আনার সেই সহযোগিতাটাই একজন সাইকোলজিস্ট করে থাকেন। সরকারি ও বেসরকারি বেশ কিছু সংস্থা অর্থমূল্যে এবং বিনামূল্যে অনলাইন ও টেলি-কাউন্সেলিং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান করছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মনোবল বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রচার করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের কথা উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট জেলা পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার সচেতনতার বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ যাতে হতাশা, উদ্বেগের বশবর্তী হয়ে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত না নেয় সেজন্য থানা পর্যায়ে মাইকিং, বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে সভা-সেমিনারে সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ ছাড়া, কেউ যদি আত্মহত্যা করার মতো মনোভাব দেখায় তবে তাকে উদ্ধার করার জন্যও জাতীয় হটলাইন নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দিলেই দ্রুত পুলিশ চলে যায় সাহায্য করতে।
এটা সত্যি যে, করোনা আমাদের জীবনকে কঠিন এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু এটাও সত্যি- এই প্রতিকূলতা চিরজীবন থাকবে না। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বজায় রাখতে হবে মানসিক শক্তি আর দৃঢ় মনোবল। আমাদের মূল্যবান সেই মনোবল যেন আমরা করোনার আঘাতে হারিয়ে যেতে না দিই।
ম্যানেজার, জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি, ব্র্যাক