কভিড-১৯ চিকিৎসায় 'ওয়ান মেডিসিন ওয়ান টার্গেট' ফর্মুলা

গবেষণা

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মুহাম্মদ শাহজাহান কুতুবী

জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি উপসর্গ (কভিড-১৯ এর উপসর্গ হিসেবে পরিচিত) পরিলক্ষিত হলে বিভিন্ন মেডিসিন ব্যবহার হচ্ছে এবং অনেক রোগীও আরোগ্য লাভ করছেন। আবার হাসপাতালে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ স্বল্পতার কারণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফুসফুসে অক্সিজেনের সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে না- এমন একটি মেডিসিন উৎপাদন করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবতে গিয়ে সালবিউটামল মেডিসিনের সন্ধান পেয়েছি। বিশেষভাবে যারা জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট উপসর্গ নিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে চিকিৎসা নিতে পারছেন না, তাদের কথা চিন্তা করে স্টাডি করেছি মাত্র। কভিড-১৯ ও এর মেডিকেশনের ওপর প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণাপত্রের ওপর ভিত্তি করে তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রায় এক হাজার মেডিসিনের মধ্যে রসায়নের বিভিন্ন বিষয়, কার্যকর রাসায়নিক গ্রুপ, ফুসফুসে এই মেডিসিনের কার্যকর অ্যাকশন, বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, একাধিক মেডিসিনের পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে 'ওয়ান মেডিসিন ওয়ান টার্গেট' ফর্মুলা তত্ত্বের ডেভেলপ করি।
সালবিউটামল :গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যমতে, এই মেডিসিন ফুসফুসে বাতাসের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয় এবং অন্যান্য মেডিসিনের তুলনায় এটি খুব ছোট হওয়ায় এর রাসায়নিক ধর্মগুলো মূল লক্ষ্যে আক্রমণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য মেডিসিন হিসেবে তালিকাভুক্ত। এই মেডিসিন নেওয়ার সময় অন্যান্য মেডিসিন নিলে সাধারণভাবে ড্রাগ ইন্টার‌্যাকশনের কথা বিবেচনা করতে হবে। তাই তাত্ত্বিক গবেষণায় 'ওয়ান মেডিসিন ওয়ান টার্গেট' মডেলের মেডিকেশন ফর্মুলাটি প্রয়োগ করেছি, যাতে কোনো মেডিসিন ইন্টার‌্যাকশন না হয়।
এক্সপেরিমেন্টাল স্টাডি
সালবিউটামলের 'ওয়ান মেডিসিন ওয়ান টার্গেট' ফর্মুলা তত্ত্বের ভিত্তিতে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট আছে এমন ১৫-২০ জনের ওপর ও জ্বর, কাশি, গলাব্যথা আছে এমন ৪০-৪৫ জন রোগীর ওপর এবং করোনা পজিটিভ এমন ১৩ জনসহ মোট ৭০-৮০ জনের ওপর প্রয়োগ করে ১৮-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব উপসর্গের প্রশমন হওয়ার শতভাগ সাফল্য পাওয়া গেছে। রোগীদের ভাষ্যমতে, তারা ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব উপসর্গের উপশম হয়ে সুস্থ হয়েছেন ও পরে পাঁচ বা সাত দিনের মেডিকেশন কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন।
রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা : ক) এক-সাত দিন জ্বর, ১০০-১০৩ ডিগ্রি; খ) সপ্তম দিন থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু, অষ্টম দিনে তীব্র শ্বাসকষ্ট। এ রকম ৭০-৮০ রোগীকে প্রয়োগ করলে সবাই তিন-পাঁচ দিনেই সুস্থ হয়েছিলেন। সম্পূর্ণ কোর্সটি পাঁচ-সাত দিনের, লেভো-সালবিউটামল সালফেট ২ মি. গ্রা. হলে পাঁচ দিন, ১ মি.গ্রা. হলে সাত দিন।
প্রথম ডোজ : ক) লেভো-সালবিউটামল সালফেট (১ বা ২ মি. গ্রা.) খাওয়ার পর একটি করে। প্রথমটি খাওয়ার পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পর দ্বিতীয়টি এবং দ্বিতীয়টির সাত-আট ঘণ্টা পর তৃতীয়টি। এভাবে ১৪ -১৫ ঘণ্টার মধ্যে মোট তিনটি। পরের দিন থেকে দিনে একটি করে ২ মি. গ্রা. ট্যাবলেট দিনে তিনবার। ১ মি. গ্রা. ট্যাবলেট দিনে চারবার। খ) শুধু প্রথম সালবিউটামলের সঙ্গে একটি মাল্টিভিটামিন সেবন করতে হবে। গ) প্যারাসিটামল ৫০০ মি. গ্রা. একটি করে দিনে তিনবার (যদি জ্বর থাকে)। ঘ) যাদের অ্যাজমাজনিত শ্বাসকষ্ট আগে থেকে ছিল, তাদের মন্টিলুকাস্ট ১০ (টেলুকাস্ট ১০ বা মোনাস ১০ বা অন্য ব্র্যান্ড) রাতে খাওয়ার আধঘণ্টা আগে চিবিয়ে সেবন করতে হবে।
দ্বিতীয় ডোজ থেকে পরবর্তী ডোজ : ক) লেভো-সালবিউটামল ২ মি. গ্রা. ট্যাবলেট দিনে তিনবার, ১ মি. গ্রা. ট্যাবলেট দিনে চারবার। খ) মাল্টিভিটামিন (১ + ০ + ০); গ) প্যারাসিটামল (৫০০ মি. গ্রা.) যদি জ্বর ৯৯ ডিগ্রি বা বেশি থাকে (১ + ১ + ১); ঘ) যাদের শ্বাসকষ্ট বেশি বা অ্যাজমাজনিত শ্বাসকষ্ট আগে থেকে ছিল তাদের জন্য মন্টিলুকাস্ট ১০ (টেলুকাস্ট ১০ বা মোনাস ১০ বা অন্য ব্র্যান্ড) রাতে খাওয়ার আধঘণ্টা আগে চিবিয়ে সেবন করতে হবে।
বাচ্চাদের জন্য : ক) লেভো-সালবিউটামল সিরাপ দিনে তিন/চারবার; খ) মাল্টিভিটামিন সিরাপ (১ + ০ + ০), গ) প্যারাসিটামল সিরাপ দিনে তিনবার।
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া :করোনার উপসর্গ জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি ও করোনার উপস্থিতি থাকলে বুকে ধড়ফড় অনুভূত হয় এবং ৬-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে। তারপর ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ১২-২৪ ঘণ্টার মধ্যে শ্বাসকষ্ট, গলা ব্যথা ও জ্বরের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ৩৬-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মেডিসিনের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এ পর্যন্ত মেডিসিনের কোনো নেগেটিভ কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়নি।
কেইস স্টাডি-১, (জুন ১৫, ২০২০) :আমার স্ত্রীর চাচা (ঢাকা, বয়স ৫২-৫৩ বছর) পাঁচ-ছয় দিন জ্বর, গলাব্যথায় ভোগার পর সপ্তম দিনে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে এই চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং নিয়মিত শ্বাসকষ্টের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা ও না কমলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে- এমন সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। ওষুধ প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শ্বাসকষ্ট প্রশমিত হয়েছিল।
কেইস স্টাডি-২ (জুলাই ৪, ২০২০) : কক্সবাজারে একই পরিবারের সাতজন (৩-৬০ বছর বয়সের) একই ধরনের জ্বর, গলাব্যথা, কাশি, তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছিল এবং করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশে প্রেসক্রাইব করা মেডিসিন কাজ না করায়, অন্য রোগীর মাধ্যমে খবর পেয়ে এই মেডিকেশন পদ্ধতিতে তিন-পাঁচ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে দ্বিতীয় বার টেস্টে করোনা নেগেটিভ শনাক্ত হয়েছিল।
সীমাবদ্ধতা ও ফলাফল : রোগীদের বয়স ৩-৬৬, মোট পর্যবেক্ষণ ৭০-৮০ জনের ওপর, অন্যান্য রোগের উপস্থিতি আছে কিনা জানা নেই। তবে যাদের ওপর প্রয়োগ হয়েছে তাদের সবাই সুস্থ হয়েছেন। তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
এখানে আমি শুধু একটি মেডিসিনের সঙ্গে একটি মাল্টিভিটামিনের সমন্বয়ে একটি মেডিকেশন পদ্ধতির কথা বলেছি যা ১২-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফল দেয়। এই মেডিকেশন পদ্ধতিতে মেডিসিন ফুসফুসের কোষকে সক্রিয় করে অক্সিজেন প্রবাহ বৃদ্ধি করে। এতে কৃত্রিম অক্সিজেন সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না। আশা করি এই পদ্ধতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
msk.chem@gmail.com
প্রধান গবেষক, কে জে কেমিক্যাল করপোরেশন
সেইকো পিএমসি, ডিআইসি, জাপান

বিষয় : কভিড-১৯