এক মালয়েশিয়ায় অনেক রায়হান কবির

জনশক্তি

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফরিদুল আলম

কাতারভিত্তিক আলজাজিরা টেলিভিশনের '১০১ ইস্ট প্রোগ্রাম'-এর একটি পর্ব ছিল 'লকড আপ ইন মালয়েশিয়াস লকডাউন', যা প্রচারিত হয় গত ৩ জুলাই। ২৬ মিনিটের ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি তরুণ রায়হান কবিরের একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়, যেখানে তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচারের বর্ণনা দেন, বিশেষ করে লকডাউন চলাকালে রেড জোনে অভিযান পরিচালনা করে দুই হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অকথ্য নির্যাতনের বর্ণনা দেন। সাক্ষাৎকারটি প্রচারের পরই নড়েচড়ে বসে মালয়েশিয়া পুলিশ এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। তারা বিভিন্ন মিডিয়ায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে রায়হান কবিরকে গ্রেপ্তার করতে। ইতোমধ্যে তিনি গত ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং সেখানে তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে ১৪ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি খুবই পরিস্কার এবং এখানে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজে দেখার কোনো অবকাশ নেই। রায়হান কবির বৈধ ভিসা নিয়েই মালয়েশিয়া গমন করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগ নেই বলে জানা গেছে। এখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কেবল নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে, এমন একটি বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলে ধরার কারণে আজ তাকে মালয়েশিয়া সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে। এদিকে আলজাজিরা তাদের প্রচারিত অনুষ্ঠানের সত্যতা স্বীকার করে রায়হানের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়া সরকারের অভিযোগ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়নি, যা আমাদের নিশ্চিতভাবেই হতাশ করবে। বিবিসি সূত্রে জানা গেছে, এই বিষয়ে কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রদূত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি (সূত্র :বিবিসি বাংলা অনলাইন, ২৫ জুলাই ২০২০)। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী জানিয়েছেন, 'শুধু একজন বাংলাদেশির জন্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের কনফ্লিক্টে যাবে না বাংলাদেশ।' আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, 'মালয়েশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই সেদেশে আটক রায়হান কবিরকে সরকার সাহায্য করবে' (সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়, ২৮ জুলাই, ২০২০)। এই দুই দায়িত্বশীল ব্যক্তির কথা থেকে যে অভিন্ন বিষয়টি পরিস্কার হচ্ছে তা হলো মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কের বিষয়টিকেই বড় করে দেখছেন।
এখানে একতরফাভাবে রায়হান কবিরের পক্ষে কিংবা মালয়েশিয়া সরকারের বিপক্ষেও মন্তব্য করার অবকাশ নেই। রায়হান কবিরের যে বক্তব্যটিকে মালয়েশিয়া সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল বলে মনে করছে, তা হচ্ছে রায়হান কবির বলেছেন, 'অনিবন্ধিত বিদেশি শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে শত শত অভিবাসীকে জেলে পাঠানো হয়েছে।' বিষয়টি বিশ্নেষণ করলে এক অর্থে দু'পক্ষেরই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। জনাব কবিরের দিক থেকে এটি তার বাকস্বাধীনতার অংশ, তিনি যা দেখেছেন, দেখছেন তা বলার অধিকার তার রয়েছে এবং বিষয়টি যে সর্বাংশে সত্য সে বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের মিডিয়াগুলোতে অনেক প্রতিবেদেন প্রকাশিত হয়েছে। আর মালয়েশিয়া সরকারের দিক থেকে এটি তারা বলতেই পারে যে, অনিবন্ধিত শ্রমিকদের পাকড়াও করা তাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ, যা তারা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কতটুকু মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটেছে সেটি প্রমাণ সাপেক্ষ বিষয়, যার প্রমাণ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়েনি, যেহেতু আজ পর্যন্ত এ নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়াল? স্পষ্টতই এখানে আমাদের সরকারের একধরনের দায়বদ্ধতার বিষয়টি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর গত ২০১৭ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত করে মালয়েশিয়া সরকার। সে সময় জি টু জি পদ্ধতিতে মাত্র ৪০ হাজার টাকা খরচে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক রপ্তানির বিধান রেখে দু'দেশের সম্মতিতে বাংলাদেশের ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে অভিযোগ করে বলা হয়- এই এজেন্সিগুলো বাস্তবে শ্রমিক নিয়োগে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় এই শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া। বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট তদন্ত কিংবা এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করে দেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কাজেই স্পষ্টতই সেদেশে অনেক অদক্ষ কিংবা আধা দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি অনেক ভুয়া এজেন্সির মাধ্যমে প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক অনিবন্ধিতভাবে সেদেশে অবস্থান করছেন, এটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যে বিষয়টি আমাদের সরকারের দিক থেকে সেদেশে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে অবগত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, সে বিষয়ে আমাদের একজন নাগরিক যদি তার মত প্রকাশের স্বাধীনতার বোধ থেকে উক্তি করেন, তাহলে তো উল্টো দূতাবাস এবং সরকারের লজ্জিত হওয়ার কথা। আর এই লজ্জা ঢাকার জন্য উচিত ত্বরিত গতিতে বিষয়টির একটি সম্মানজনক সুরাহা করা। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার দু'জন আইনজীবী রায়হান কবিরের পক্ষ নিয়ে আদালতে লড়তে আবেদন করেছেন। আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও সরকারকে চিঠি দিয়ে রায়হান কবিরের পক্ষে যথাযথ আইনি লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছে। আমরা কি রায়হান কবিরের ব্যাপারে হাল ছেড়ে দেব?
সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : জনশক্তি