সাক্ষাৎকার: দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের এখনই সময়

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শেখ রোকন

বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের পথিকৃৎ দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া ২০০৯ সালে ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট। এর আগে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক  থেকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গ্রামীণ  শক্তির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষ  অবদানের জন্য ২০০৯ সালে আবুধাবিতে প্রথম জায়েদ ফিউচার পুরস্কারে ভূষিত হন  দীপাল বড়ুয়া। তিনি ওয়ার্ল্ড ফিউচার কাউন্সিলের সদস্য এবং গ্রিন ক্লাইমেট  ফান্ডের বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে  'দ্য পুওরস অলওয়েজ পে ব্যাক'। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের  অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর দীপাল চন্দ্র বড়ুয়ার জন্ম ১৯৫৪ সালে  চট্টগ্রামে।

সমকাল : চীন বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এ মাসের মাঝামাঝি অংশীদারিত্ব কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের মধ্যে দুটি কোম্পানির চুক্তিও হলো। তার মানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারের আগ্রহ বাড়ছে?
দীপাল বড়ূয়া : বাড়তেই হবে। কারণ গোটা বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও দূষণমুক্ত এই জ্বালানির বিকল্প নেই। আমরা অনেক দিন ধরে সরকারকে বলে আসছি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহী এবং উদ্যোগী। ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানির কর শূন্য করে দিয়েছিলেন। এর ইতিবাচক প্রভাব হয়েছিল ব্যাপক। প্রধানমন্ত্রী নিজেও পরিবেশবাদী, জাতিসংঘ তাকে 'চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ' পুরস্কার প্রদান করেছে।
সমকাল : কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে যে গতিতে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্য ছিল, তা কি আমরা পেরেছি? এখন কত শতাংশ নবায়নযোগ্য?
দীপাল বড়ূয়া : ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হয়েছিল জ্বালানি নীতিতে। কিন্তু বাস্তবে সেটি এখনও সম্ভব হয়নি। এখন সব মিলিয়ে ২৪-২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। হিসাব মতো দুই-আড়াই হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসার কথা। কিন্তু এখন কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ যোগ করেও সব মিলিয়ে সম্ভবত ৬২৮ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হয়।
সমকাল : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, আরও প্রায় ১৩০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চলছে।
দীপাল বড়ূয়া : তিনি ঠিকই বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলো এ ব্যাপারে জোর দিয়েছে। তবে এখনও কাজ চলছে। ওই বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে অঙ্কটি বাড়বে। কিন্তু তার পরও আপনি দেখবেন সব মিলিয়ে ১০ শতাংশ হচ্ছে না। আর আপনাকে মনে রাখতে হবে, এই লক্ষ্যমাত্রা অনেক আগে নির্ধারিত। বিদ্যমান বাস্তবতায় ও বৈশ্বিক প্রবণতায় দাঁড়িয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানো দরকার।
সমকাল : কিন্তু ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কি সম্ভব? আপনার কাছেই শুনেছিলাম, সম্ভাব্য সব এলাকায় গৃহস্থালি সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার হোম সিস্টেম পৌঁছে গেছে।
দীপাল বড়ূয়া : দেখুন, রিনিউয়েবল এনার্জি মানে কেবল সোলার হোম সিস্টেম নয়। এটা ঠিক, সোলার হোম সিস্টেমে বাংলাদেশ সফল, ৬০ লাখ সিস্টেম আমরা স্থাপন করতে পেরেছি। এটা বৈশ্বিক একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আপনি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকান, তারা এখন শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় আরও অনেক খাত এখনও পড়ে রয়েছে।
সমকাল : যেমন?
দীপাল বড়ূয়া : যেমন, সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ ব্যবস্থা। বাংলাদেশে এখন ১৩ লাখ ডিজেল চালিত পাম্প ব্যবহূত হয় ক্ষেতে সেচ দেওয়ার জন্য। এর মধ্যে অনায়াসে দুই লাখ পাম্পকে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে করে একদিকে যেমন আমদানিকৃত ডিজেলের ওপর চাপ কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে; অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে। টেকসই উন্নয়নের জন্যই তো আমাদের ডিজেলের বদলে সোলার পাম্পের দিকে যাওয়া দরকার। শুধু তাই নয়, এসব সোলার পাম্প থেকে জাতীয় গ্রিডে সাড়ে আটশ' মেগাওয়াট বিদ্যুৎও দেওয়া সম্ভব।
সমকাল : আমার মনে আছে, কয়েক বছর আগেও আপনি এই খাতকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় আখ্যা দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত কতগুলো সৌরচালিত পাম্প স্থাপন করা গেছে?
দীপাল বড়ূয়া : খুব বেশি নয়, আবার কমও নয়। সব মিলিয়ে দুই হাজার হবে। এখন সরকারকে এই খাতে জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা যদি অর্জন করতে হয়, তাহলে সম্ভাবনাময় সব খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে এত বিনিয়োগ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে করা যাবে না কেন?
সমকাল : নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগের প্রস্তাব কি সরকারের কাছে দিয়েছেন আপনারা?
দীপাল বড়ূয়া : নিশ্চয়ই দিয়েছি। বিভিন্ন সময়েই আমরা এ ব্যাপারে কথা বলে আসছি। এ মাসেই আমরা সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কভিড-পরবর্তী নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছি সরকারকে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো লিখিত প্রস্তাবে আমরা বলেছি কোন কোন খাতে কীভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। প্রস্তাবে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে ৯টি খাতের কথা বলেছি। যেমন- সোলার পাম্প তো বললাম। সরকার যে 'আমার গ্রাম আমার শহর' প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলছে, আমরা সেটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবি করেছি।
সমকাল : সেটি কীভাবে?
দীপাল বড়ূয়া : যে ৩০ হাজার গ্রাম এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে, সেখানে সবই নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব। সোলার হোম সিস্টেম ও কৃষিতে সোলার পাম্প ছাড়াও সুপেয় পানি উত্তোলনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। গ্রামভিত্তিক বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইতোমধ্যেই স্ট্রিট লাইট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব গ্রামে এই লাইট স্থাপন করা যেতে পারে। এতে করে গ্রামীণ পরিবেশ যেমন অক্ষুণ্ণ থাকবে, তেমনই পাওয়া যাবে শহরের মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে যদি আপনি গ্রামে শহরের সুবিধা দিতে যান, তাহলে পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আপনি তো নদী ও পানি নিয়ে কাজ করেন। আমরা ভাসমান উৎস থেকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাবও দিয়েছি। সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে আপনি কোল্ডস্টোরেজ পরিচালনা করতে পারেন। সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সাইক্লোন শেল্টারগুলোকে আরও নিরাপদ করে তোলা সম্ভব।
সমকাল : এ জন্য তো বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
দীপাল বড়ূয়া : নিশ্চয়ই প্রয়োজন হবে। সেই বিনিয়োগ করাও দরকার। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানিই আমাদের ভবিষ্যৎ। এটা নিরাপদ ও টেকসই। জীবাশ্ম জ্বালানি মানে আপনি অন্যের ওপর নির্ভরশীল। প্রচলিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার যত বাড়বে, বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা তত বাড়বে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিজস্ব। দেশকে স্বনির্ভর করতে হলে এর বিকল্প নেই।
সমকাল : এই বিনিয়োগের অর্থ আসবে কোথা থেকে?
দীপাল বড়ূয়া : দেখুন, আমি মনে করি বিষয়টি যতখানি না অর্থের, তার চেয়ে বেশি সিদ্ধান্তের। সরকার যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আইডিবি, এডিবি, বিশ্বব্যাংকের মতো অর্থকরী প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসবে। মনে রাখতে হবে, পরিবেশ রক্ষা বা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায়ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের শিকার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে থাকা বাংলাদেশের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের বিশেষ নজর রয়েছে। আমরা যদি সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকেও অর্থায়ন সম্ভব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন যে, ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাব আমরা। সেক্ষেত্রে খুব বেশি সময় হাতে নেই।
সমকাল : করোনা পরিস্থিতিও তো আমাদের মনে করিয়ে দিল যে, প্রকৃতির ক্ষতি করে উন্নয়ন চিন্তা বাদ দিতে হবে।
দীপাল বড়ূয়া : একদম ঠিক বলেছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের এটাই মোক্ষম সময়। করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে এখন থেকেই টেকসই, নিরাপদ, পরিবেশসম্মত জ্বালানির জন্য সম্ভাব্য সব কাজ শুরু করতে হবে।