করোনাকালীন শিক্ষা কার্যক্রম

বিভ্রান্তি নয়, অভিন্ন নির্দেশনা চাই

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বন্ধ থাকা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা কেবল অবস্থার উন্নতির বিষয়ই নয় বরং নীতিগত সিদ্ধান্তও বটে। সংক্রমণ না কমায় অনানুষ্ঠানিকভাবে অনলাইন, টিভিসহ নানা মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তায় রয়েছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত '১৩ লাখ এইচএসসি পরীক্ষার্থী যাবে কই' শিরোনামের প্রতিবেদনে এসেছে, গত ১ এপ্রিল থেকে তাদের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষার কয়েকদিন আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর মানসিক অবস্থা এলোমেলো হয়ে গেছে। বিপাকে পড়েছে প্রাথমিক ও জুনিয়র মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরাও। সংক্রমণ কমলে সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে ডিসেম্বরেই কীভাবে শিক্ষার্থীরা এ দুই পরীক্ষার জন্য বসবে- সেটা ভাবনার বিষয়। তবে আমরা দেখেছি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা কিংবা আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার আলোচনায় সবসময়ই করোনা পরিস্থিতি উন্নতির বিষয়টি সামনে আসছে। অথচ হঠাৎ করেই কীভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ করোনার মধ্যেই উচ্চ শিক্ষার কোর্সে পরীক্ষার তোড়জোড় শুরু করেছে? এতে অন্তত চৌদ্দশত চিকিৎসক-শিক্ষার্থীর সংকট কেবল এ কারণে নয় যে, ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই পরীক্ষা হচ্ছে। তারচেয়ে বড় সমস্যা হলো, করোনার কারণে উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি থাকা চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করে সরকারি হাসপাতালে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এরই অংশ হিসেবে এসব পরীক্ষার্থীর উল্লেখযোগ্য অংশই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সেবা প্রদান করছে। সেবা দিতে গিয়ে তাদের অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, কেউ হয়তো আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে আছে। বিষয়টি বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ না জানার কথা নয়। তারপরও তারা এমডি ও এমএস কোর্সে ও থিসিস অ্যান্ড থিসিস ডিফেন্স পরীক্ষার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। এর আগে আমরা দেখেছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু ভুয়া আইডি থেকে ঈদের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার 'গুজব' ছড়ানো হয়। এতেও বিভ্রান্তিতে পড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। সব বিভ্রান্তির নিরসনে করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা ও পরীক্ষা কার্যক্রম বিষয়ে অভিন্ন নীতিমালা জরুরি বলে আমরা মনে করি। এক্ষেত্রে সরকার একটি নির্দেশনা জারি করতে পারে। যেটা কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য হবে না বরং বিএসএমএমইউসহ স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিষয়ের উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীদের জন্যও কার্যকর হবে। দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় করোনা-পরবর্তী সিলেবাস, ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে কাজ শুরু করেছে বলে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা বলে আসছেন। তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম খোলার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা মনে করি, কেবল শিক্ষা-সংশ্নিষ্ট পরিকল্পনা নিলেই হবে না, একই সঙ্গে করোনা সংক্রমণ কমলেও ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, তারও নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। করোনার মধ্যেই এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ঘোষণার বিষয়টি আমরা ইতিবাচক বলে মনে করি। ৯ আগস্ট থেকে অনলাইনে এইচএসসির ভর্তি কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু টেলিভিশনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে, সে ব্যাপারে কেবল বিস্তর অভিযোগই নেই বরং প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীরই এ মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সঙ্গতিই নেই। ফলে জোর দিতে হবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমেই। করোনা-দুর্যোগের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারই হয়তো আর্থিক সঙ্গতি হারিয়েছে, তাই সরকারের নির্দেশনায় ঝরেপড়া ও বাল্যবিয়ে রোধের বিষয়টিও ভাবতে হবে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই গ্রামের। গ্রামের পরিবেশ, মানুষের অবস্থা, করোনা পরিস্থিতি তথা সার্বিক বিষয় মাথায় রেখেই নির্দেশনা তৈরি করা চাই। ৬ আগস্ট পর্যন্ত যেহেতু শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে, সবচেয়ে ভালো হয় এ সময়ের মধ্যেই অভিন্ন নির্দেশনা প্রস্তুত করে তা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া।