সমকালীন প্রসঙ্গ

বিশেষ পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর হজ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

সারাবিশ্বে চলছে করোনা মহামারি। যেহেতু এটি এক সংক্রামক ব্যাধি, তাই এবারের পবিত্র হজব্রত পালনে সৌদি কর্তৃপক্ষ বেশ সচেতনতার সঙ্গে কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের গৃহীত এসব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে রয়েছে, অধিক সংখ্যক মানুষকে এ বছর হজে অংশ নিতে না দেওয়া, সৌদি আরবের অধিবাসী মানুষদেরই এ বছর হজ করতে অনুমতি প্রদান, বর্তমানে সৌদি আরবে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের স্বল্প সংখ্যককে হজ পালনের সুযোগ দেওয়া, বিদেশ থেকে প্রয়োজনে প্রতীকী হিসেবে অল্প মানুষকে হজব্রত পালনের অনুমতি দেওয়া, হজে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা কোনো মতেই দশ হাজারের অধিক না হওয়া, পৃথিবীর ১৬০ দেশ থেকে উল্লিখিত হাজিদের নির্বাচন করা, হজে গমনকারীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন পালন এবং করোনা পরিস্থিতিতে অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ মেনে চলা। জাতীয় হজ কমিটির তথ্যানুযায়ী, ২২২ বছর পর হজের আনুষ্ঠানিকতায় এমন পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হয়েছে; যার মূল উদ্দেশ্যই হলো করোনার ভয়াল থাবা থেকে বিপন্ন মানবতাকে রক্ষা করা। কেননা ইসলাম মানুষের জীবনকে, জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবর্তিত এই বিশ্ব-পরিস্থিতির কারণে হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গৃহীত এসব পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ থেকে এবারই প্রথম কেউ হজ পালনে যেতে পারবেন না; যদিও ইতোপূর্বে প্রায় পৌনে এক লাখ বাংলাদেশি এবার হজযাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। অবশ্য বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনেক আগেই দক্ষিণ আফ্রিকা, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ব্রুনাইসহ বেশ কিছু দেশ এ বছরের হজযাত্রা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল। হাজিরা অন্যান্য বছরের মতো এবার মিনার তাঁবুতে অবস্থান করতে পারবেন না, বরং তাদের সংরক্ষিত ভবনে থাকতে হবে, যাতায়াতের জন্য ২০ জন করে নির্দিষ্ট করা গ্রুপ একসঙ্গে একটি বাসে আরোহণ করবেন, যত্রতত্র ঘোরাফেরা করা যাবে না, পবিত্র কাবা শরিফ ও হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া যাবে না, নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে তাওয়াফ, সায়ী, নামাজের জামাত ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে, মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক, নিজে থেকে কোনো খাবার বহন ও গ্রহণ করা যাবে না, ব্যাংকের মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করতে হবে, সাধারণ মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ থাকবে ইত্যাদি নির্দেশনা প্রদত্ত হয়েছে। এবারের হজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এই প্রথমবারের মতো হজের খুতবা বাংলা, ফার্সি, ইংরেজি, ফরাসি, ইন্দোনেশিয়ান ও উর্দুসহ দশটি ভাষায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করা হবে।

হজ বিশ্ব-মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তম সমাবেশ। এটা খোদায়ি অনুশীলন এবং প্রকৃত মানুষ হওয়ার তালিম গ্রহণের স্থান, মিথ্যা আমিত্ব ও শিরকের পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি খোঁজার স্থান। শয়তান ও অশুভ শক্তির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ, পৌত্তলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ তথা বারাআত ঘোষণা এবং খোদার সঙ্গে মিলনের স্থল। একই সঙ্গে তা পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা 'শয়তানের ইবাদত করো না'- এ প্রতিজ্ঞারও নবায়নস্থল এবং 'আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) মুশরেকদের ওপর অসন্তুষ্ট' এ বাণীর প্রতি সাড়া দেওয়ার স্থান। এ স্থান ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর ঔজ্জ্বল্য তুলে ধরা এবং তাদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক সম্মান তুলে ধরার স্থান। হজ হলো জীবনের যে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যহীনতা ঠিক তার বিপরীত। শয়তানি শক্তি মানুষকে যে দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যের দিকে পরিচালিত করে, হজ হলো তার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। যে শয়তানি গোলক ধাঁধার আবর্তে মানুষ ঘুরপাক খাচ্ছে, এই হজ পালনের মাধ্যমে তা থেকে আপনি বেরিয়ে আসতে পারবেন। হজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনার কাছে মুক্ত ও পরিস্কাররূপে ফুটে উঠবে সেই পথ, যে পথের সাহায্যে আপনি চিরন্তন জগতে উত্তীর্ণ হয়ে মহান আল্লাহর সমীপে পৌঁছাতে পারবেন।

মহান আল্লাহ হজ সম্বন্ধে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন- 'মানব জাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায় (মক্কার অন্য প্রাচীন নাম), ওটা বরকতময় ও বিশ্ব জগতের দিশারী। ওতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে, যেমন মাকামে ইব্রাহিম এবং যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ। মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশে ওই গৃহে হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য। কেউ প্রত্যাখ্যান করলে সে জেনে রাখুক আল্লাহ বিশ্ব জগতের মুখাপেক্ষী নন (৩ :৯৬-৯৭)।

ইসলামি বিশেষজ্ঞ, ফকিহ ও মোহাদ্দেসিন হজকে ইসলামের পঞ্চম রোকন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত ইহরাম বাঁধা অবস্থায় আরাফাত, মুযদালিফা, মিনায় কংকর নিক্ষেপ, কাবাঘর তাওয়াফকরণ, সাফা-মারওয়া পাহাড় সাঈকরণ, কোরবানি করা এবং সবশেষে মাথার চুল মুণ্ডন বা কর্তন করার ইচ্ছা বা সংকল্পকেই মূলত হজ বলে। এহেন সংকল্প থেকে মানুষ যাতে নিজেকে বঞ্চিত না করে তার জন্যই আল্লাহপাক বান্দাদের প্রতি এ নির্দেশনা অবতীর্ণ করেছেন।

মহানবী (সা.) প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য হজ পালনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইরশাদ করেন, 'বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার পাথেয় ও সফরের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যে হজ পালন না করে সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করুক কিংবা নাসারা হয়ে মরুক (মিশকাত)। মানবতার মহান মুক্তিদূতের মুখে এ ধরনের সতর্ক বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা হজের সবিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারি।

হজকে আরও অধিক কল্যাণকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য ইসলাম আধ্যাত্মিক, ভাবগম্ভীর ও পবিত্র পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে ঐশী নুরের স্নিগ্ধ পরশে আত্মা হয় তৃপ্ত, হৃদয় হয় সজীব, চিত্ত হয় সুপ্রসন্ন ও সুদৃঢ়। তাই বলা যায় হজ শরিয়তের একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থা। আল্লাহ প্রদত্ত আধ্যাত্মিক বিভায় বিকশিত হয়ে ওঠে হাজিদের মানস ও মন। ইবরাহিমি চেতনায় তাঁরা আত্মত্যাগী হয় সর্বক্ষেত্রে। বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যের শপথ নেওয়ার অনন্য সুযোগও হচ্ছে এই হজ। আর এ হজের দ্বারাই জাগতিক শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি অর্জন করা যায়।

অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়