করোনাদুর্যোগ

মহামারির দহনকালে মধ্যবিত্তের দুর্দশা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. প্রণব কুমার পান্ডে

কভিড-১৯ এর সর্বনাশা প্রভাব বিশ্বজুড়ে প্রায় বেশিরভাগ দেশের জন্য একটি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এটি কেবল জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাই সৃষ্টি করেছে তা নয়, দেশগুলোর অর্থনীতিকেও পঙ্গু করেছে। সুতরাং এই মহামারিজনিত জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক পরিণতিগুলো কাটিয়ে ওঠার কৌশল অবলম্বনে বিভিন্ন দেশের সরকারকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষকে বেকার করেছে। অবিচ্ছিন্ন লকডাউন এবং সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন নিয়ন্ত্রকমূলক কৌশল বাস্তবায়নের ফলে বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের কর্মীর সংখ্যা হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং বেসরকারি খাতে এখনও যারা চাকরি করছেন, তাদের অসংখ্য সুযোগ-সুবিধা কর্তন করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো একুশ শতকের এই নজিরবিহীন মহামারিকালীন বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অনেক কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকাভিত্তিক বিপুল সংখ্যক কর্মচারী বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়েছেন। বেকারত্ব এই ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। কারণ তাদের পক্ষে ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া করে চাকরিবিহীন অবস্থায় থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। ফলে বাধ্য হয়েই তারা নতুন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই মহামারিজনিত কারণে চাকরি হারানো মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের যন্ত্রণার বিভিন্ন গল্প সামাজিক, প্রিন্ট এবং বৈদ্যুতিন মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে। বহু বছর ধরে শহরে বসবাস করার পরেও সন্তানদের উন্নত শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া ছাড়া তাদের কাছে কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। আমি মিডিয়ার সামনে অনেক মানুষকে তাদের দুর্দশার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলতে দেখেছি যে, ঢাকা শহরের আধুনিক জীবন পদ্ধতি ছেড়ে গ্রামে গিয়ে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো তাদের জন্য এবং সন্তানদের জন্য অনেক কঠিন হবে জেনেও তারা গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হবে তাদের সন্তানদের, যারা ঢাকার বিভিন্ন নাম করা স্কুলে পড়াশোনা করত। এই সন্তানেরা গ্রামের নতুন স্কুল এবং কলেজগুলোর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বেশ অসুবিধায় পড়বে, কারণ ঢাকার স্কুল ও কলেজগুলোর মান এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মানের সঙ্গে কোনোভাবেই তুলনীয় হতে পারে না। অব্যাহত লকডাউন এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এসব মানুষ গত কয়েক মাসে তাদের সঞ্চয় খরচ করে জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে রিক্ত হস্তে ঢাকায় অবস্থান করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বিধায় তারা গ্রামে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঢাকা শহরে অবস্থান করে বাসা ভাড়া পরিশোধ করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মহামারি চলাকালে গরিব মানুষের জীবনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের যন্ত্রণার বিষয়টি সরকারি পর্যায়ে তেমন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো- এসব মানুষ এই মহামারি চলাকালীন বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষের মতো তারা সরকারি সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে পারেননি কিংবা সাহায্য বা ত্রাণসামগ্রীর জন্য রাস্তায় নামতে পারেননি। এই গোষ্ঠীর পক্ষে খুব সহজেই কোনো সহায়তা পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ মহামারি চলাকালে যখন তারা বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন সরকার বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোনো সহায়তা প্রদান করা হয়নি। অন্যদিকে, ব্যাপক সংখ্যক মধ্যবিত্ত মানুষের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঢাকা শহরের বাড়ির মালিকদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। কারণ অনেক বাড়ির মালিক ভাড়ার ওপর নির্ভর করে সংসার পরিচালনা করেন এবং অনেক মালিককে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। ফলে বাসাগুলো শূন্য হওয়ার ফলে বাসার মালিকদের জীবন ও জীবিকা চরমভাবে প্রভাবিত হবে। এদিকে, আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়া সূত্র থেকে জেনেছি, অনেক মানুষ শহর থেকে গ্রামে ফিরে যাওয়ায় ঢাকা শহরে অনেক বাসা খালি হয়ে গেছে। এই শ্রেণির মানুষের গ্রামে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করবে ভিন্ন রকম জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার সময়। গ্রামে ফিরে আসার ফলে তারা ঢাকার জীবনযাত্রার সুবিধাগুলো হারাবেন। তাদের মানসিক অস্থিরতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কভিড-১৯ মহামারি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে বাড়িতে থাকার বাধ্যবাধকতা ইতোমধ্যে অনেক মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

সুতরাং, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কষ্টের সময়ে তাদের সহায়তা করার জন্য কৌশলগুলো চিহ্নিত করার বিষয়ে সরকারের চিন্তা করা উচিত। এই শ্রেণির মানুষ এমন পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন যে, তারা তাদের দুর্দশার চিত্রগুলো অন্যদের কাছে কিংবা সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে উপস্থাপন করতে চাইবেন না। তারা জীবন উৎসর্গ করবেন কিন্তু অন্যের কাছে সাহায্য চাইবেন না। কভিড-১৯ মহামারির সময়ে এসব মানুষকে জীবন সংগ্রামে সহায়তা প্রদান করা সরকারসহ প্রত্যেক নাগরিকের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমরা সবাই জানি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সংকটের সময়ে মানুষকে সাহায্য করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার মালিকদেরও উচিত এসব মানুষকে চাকরিতে রেখে তাদের সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসা। এটি সত্য যে, কভিড-১৯-এর দ্বারা ক্রমাগত অচলাবস্থার সৃষ্টি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরাও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। তবুও কর্মীদের ছাঁটাই কোনো টেকসই সমাধান নয়। সুতরাং কিছু সুবিধা হ্রাস করে হলেও তারা কর্মীদের চাকরিতে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। আমরা সবাই জানি যে, আমরা অবশ্যই কভিড-১৯ দ্বারা সৃষ্ট পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠব। আমরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মহামারি দ্বারা সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা থেকেও মুক্তি লাভ করব। সবার উচিত এই শতাব্দীর সবচেয়ে খারাপ সময়ে পরস্পরকে যথাসম্ভব সহায়তার জন্য এগিয়ে আসা।

অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়