জনস্বাস্থ্য

কী ফেলবেন, কোথায় ফেলবেন, ভেবে ফেলুন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জুলফিকার আলি মাণিক

মার্চের শেষে দেশে 'ছুটি'র নামে র্দুবল লকডাউন শুরু হওয়ার ক'দিন পরের একটি ঘটনা। তখন করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ডজন ডজন পরামর্শ অনুসারে ঢাকার লেখাপড়া জানা সমাজে ভিটামিন-সি খাওয়ার ব্যস্ততা তৈরি হয়। সে রকম সময় এক বিকেলে দেখি, আমাদের বাসার বারান্দায় কংক্রিটের রেলিংয়ের ওপরে ভিটামিন-সি সদৃশ আধখাওয়া একটি ট্যাবলেট পড়ে আছে। আমি থাকি ১৫ তলা একটি ভবনের আট তলায়। ওপরে আরও সাতটি ফ্ল্যাট বাসা, সবার রাস্তামুখী একই রকম বারান্দা রয়েছে। কোনো পাখি ভিটামিন-সি ট্যাবলেট খেতে খেতে মাঝপথে ঠোঁট থেকে বারান্দার রেলিংয়ে ফেলে যাবে, এমনটা হওয়ার সুযোগ নেই। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ওপরের কোনো প্রতিবেশী আধখাওয়া ভিটামিন সি ট্যাবলেট নিজের বারান্দা থেকে সামনের ফাঁকা রাস্তার উদ্দেশ্যে থুথু ফেলার মতো করে মুখ থেকে ছুড়ে ফেলেছেন। সেটি এসে পড়েছে আমাদের বারান্দার রেলিংয়ে।

লেখাপড়া জানা পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীরা থাকেন আমাদের আবাসিক ভবনে। খুব দুশ্চিন্তা হলো এই ভেবে, কেন প্রতিবেশী নিজের বাসার ময়লা রাখার পাত্রে না ফেলে বাইরে রাস্তায় ফেলতে চাইলেন? আরও উদ্বেগ হলো এই ভেবে যে, আধখাওয়া ভিটামিন-সি কারও মুখের লালা বহন করছে। হয়তো ট্যাবলেটটি মুখ থেকে ফেলার সময় কিছু থুথুও বেরিয়ে আসতে পারে, যা বাতাসে ভেসে আমার বারান্দা কিংবা অন্য কোথাও পড়েছে, যা দেখার ও জানার উপায় নেই। আধখাওয়া ভিটামিন-সি কিছু একটা দিয়ে ঠেলে বাইরের রাস্তায় ফেলে দিতে পারতাম। ভাবলাম, সেক্ষেত্রে ওপরের প্রতিবেশী যে ভুল করেছেন, আমি তারই এক ধরনের পুনরাবৃত্তি ঘটাব। সেটি এড়াতে খুব সাবধানে একটি কাগজের ভেতরে ট্যাবলেটটি পেঁচিয়ে বাসার ময়লার পাত্রে ফেলে দিলাম।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় বলেই হয়তো মনের মধ্যে একটি অস্বস্তি দানা বাঁধল; না হলে এ নিয়ে এত ভাবতাম না, কেবল বিরক্ত হতাম। অস্বস্তির কারণ সত্যি হলো ক'দিনের মধ্যে। আরেকদিন দুপুরে দেখি ওপর থেকে একটি সার্জিক্যাল মাস্ক উড়ে আমার বারান্দার সামনে দিয়ে নিচে পড়ছে। তার একটু পর কাপড়ের তৈরি বাজারের একটি লাল রঙা ব্যাগও উড়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারকমে সিকিউরিটির কাছে জানতে চাইলাম, আমাদের ভবনে খানিক আগে কেউ বাজার নিয়ে এসেছেন কিনা? হ্যাঁ সূচক উত্তর পাওয়ায় আরও জেনে নিশ্চিত হলাম যে, বাজারের ব্যাগ ছিল লাল রঙের, যিনি এসেছেন তার মুখে মাস্ক ছিল এবং আমাদের কয়েক মেঝে ওপরে থাকেন। বুঝতে বাকি রইল না, ওই প্রতিবেশী বাসায় বাজার বের করে ব্যাগ ও মাস্ক বারান্দা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলেছেন। কোন চিন্তা বা মানসিকতা থেকে তিনি এমন করেছেন জানি না। তবে এটা নিশ্চিত, তার মাথায় সেই বোধ কাজ করেনি যে, তিনি এভাবে অন্যদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছেন।

করোনা মোকাবিলার শুরুর দিকে কোনো পরিবারে করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলে গোটা ভবনটি লকডাউন করেছে সরকার। দেশে সংক্রমণের বিস্তৃতি ঘটলে সেই কৌশল অকার্যকর হয়। সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবরে দেখলাম, কারোনা মোকাবিলার কৌশলে আবার প্রয়োজনে ভবন লকডাউনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ভেতরের পরিবারগুলো তাদের বাসার বারান্দা বা জানালা দিয়ে থুথু ও নাক ঝেড়ে পানি ফেলা ও নানা জিনিস ছোড়ার অভ্যাস অব্যাহত রাখলে ভবন লকডাউন কতটা সুফল দেবে? এক্ষেত্রে সরকার বলতে পারে, প্রত্যেক ঘরের ভেতর পাহারাদার বসানো সম্ভব নয়। এ কথা সত্য। কিন্তু সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে দেশের মানুষের এসব অভ্যাস ও স্বভাব আমরা এতকাল এড়িয়ে গেলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণ-পরবর্তী বাস্তবতায় এসব বিপজ্জনক, যা পাল্টানোর জন্য শিক্ষা ও সচেতনতামূলক বহুবিধ কার্যকর উদ্যোগ বিলম্ব না করে দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন।

পথ চলতে চলতে অবলীলায় আমার থুথু ফেলি, নাক ঝাড়ি; যে কোনো জিনিস রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিই। নগণ্য কিছু ব্যক্তির ব্যতিক্রম ছাড়া, এটিই আমাদের প্রাচীন স্বভাব, যা আজও পাল্টাতে পারিনি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই রাস্তায় কোনো কিছু ফেলার যথাযথ আয়োজন নেই, কিন্তু বাসায় ময়লা ফেলার পাত্র থাকার পরও জানালা ও বারান্দা দিয়ে ছুড়ে ফেলার বদভ্যাস বলে দেয় সমস্যাটা শুধু আয়োজনের ঘাটতিতে নয়। বহুদিন দেখেছি গ্লাভসও ওপর থেকে উড়ে এসে নিচে পড়ছে। এসব চর্চা আমাদের প্রকৃত শিক্ষার অভাবের ফসল। অনেকে বলতে পারেন, এই শিক্ষা পরিবারে দেখার কথা। আমি বলব না, পরিবারের অভিভাবকদেরই যদি এই শিক্ষা না থাকে, তারা দেবেন কী করে? আমাদের দেশে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তবমুখী কার্যকর শিক্ষা দেওয়ার কোনো পরিকল্পিত আনুষ্ঠানিক আয়োজন না থাকায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরি হয়নি।


আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির কাজে কয়েক বছর আগে আমেরিকার দু'জন সাংবাদিক এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ কাজ করি। দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে যাই। একটি গ্রামে গিয়ে দেখি, শৌচকর্ম করার পর কীভাবে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয়, সেই প্রশিক্ষণ বিদেশি তহবিলে গ্রামের পরিবারগুলোকে দিচ্ছে একটি এনজিও। প্রশিক্ষণটি প্রশংসার, কিন্তু জীবনের এই মৌলিক শিক্ষাটুকু বিদেশিদের টাকার 'হ্যান্ড ওয়াশিং প্রকল্প'-এর ওপর নির্ভর করে দিতে হচ্ছে দেখে লজ্জা অনুভব করলাম। রাজধানীতে বসে মাইকে আর টকশোতে উন্নয়নের জোয়ারের যত কথাই আমরা বলি না কেন, এটা নির্মম সত্য ও লজ্জার যে, দেশের মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক শিক্ষা ও সচেতনতা আমাদের সরকারগুলো নিজ দায়িত্বে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেনি। ছোটবেলায় মায়ের মুখে একটি কথা অসংখ্যবার শুনেছি- 'নিজের ভালো নিজেকে বুঝতে হয়, নিজের ভালো নিজে না বুঝলে অন্য কেউ ভালো করে দেবে না।' আমাদের দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক শিক্ষা প্রদান ও সচেতনতা তৈরির কাজটি যে আমাদের সরকারগুলোর কাজ, বিদেশি তহবিলের মুখাপেক্ষী হয়ে করার কাজ নয়, সেটি আমরা না বুঝলে তার খেসারত আমাদেরকেই দিতে হবে। দেশের অশিক্ষা ও পরনির্ভর শিক্ষা-সচেতনতা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কঠিন বাধা।

ক্রমাগত অসততা ও দুর্নীতির মানসিকতার সংক্রমণ আমাদের অস্বস্তির জীবন দিয়েছে। মানব বর্জ্য নিস্কাশনের পথে বসানো ম্যানহোলের লোহার ঢাকনা থেকে শুরু করে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি হয় দেশের ব্যাংক ও সরকারি প্রকল্পগুলো থেকে। মাত্র কয়েক বছর আগে ঢাকা সিটি করপোরেশন শহরে ময়লা ফেলার লোহার তৈরি ছোট ছোট অনেক ঝুলন্ত পাত্র স্থাপন করেছিল। তা কয়েক মাসও টেকেনি, ভেঙে চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন একটিও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। ওই প্রকল্পে ব্যয় করা জনগণের বিপুল টাকার পুরোটাই গচ্চা গেছে। তবে করোনা-পরবর্তী বাস্তবতায় দেশের ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর, জেলা ও উপজেলা শহরে স্থানীয় সরকারগুলো পথচলা মানুষের থুথু ফেলা ও নাক ঝাড়ার জন্য টেকসই কিছু আয়োজন ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে পারে। মানুষ যেন সেসব ব্যবহার করতে সচেতন হয়, তার জন্যও লোক দেখানো নয়, কার্যকর শিক্ষা ও প্রচারণা থাকতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে স্কুলের বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রমে স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সেই শিক্ষা যেন শুধু নম্বর পেয়ে পাস করার জন্য না হয়, সেটি যেন হয় জীবনের স্থায়ী শিক্ষা। তাহলে আজকের শিশুরাই সেই শিক্ষা ছড়িয়ে দেবে তাদের ঘরে ঘরে, অভিভাবকদের পরিবারে এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে।

সাংবাদিক
ঢাকা, ২৫ জুলাই, ২০২০