জনতা ব্যাংক

শুধু ব্যক্তির বদলে সুফল মিলবে?

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

দেশের ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খলা বড় রকমের আর্থিক সমস্যা-সংকটের সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা প্রকট। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। মেয়াদপূর্তির আগেই এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান জামালউদ্দিনকে সরিয়ে মঙ্গলবার নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এস এম মাহফুজুর রহমানকে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে হঠাৎ এভাবে চেয়ারম্যান পরিবর্তন নিকট অতীতে ঘটেনি। আমাদের স্মরণে আছে, হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর সোনালী ব্যাংকের পুরো পর্ষদ বাতিল করা হয়েছিল। তবে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির কারণে ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে পদত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে সরকার নিজেই অব্যাহতি দিয়েছে পদত্যাগের কোনো সুযোগ না দিয়ে। এর কারণটা প্রকাশ হওয়া দরকার। আমরা জানি, ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত কিংবা ব্যক্তি খাতের বেশিরভাগ ব্যাংকের অবস্থাই ভালো নয়।

তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো রয়েছে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। অভিযোগ আছে, বিগত এক দশকে শুধু চেয়ারম্যানদের 'বিশেষ দৃষ্টি'র কারণেই জনতা ব্যাংকের মন্দ ঋণ সবচেয়ে স্টম্ফীত হয়েছে। এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। আমরা গভীর হতাশা ও বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যানও এমন এক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ঋণ প্রস্তাবে 'রাজি' হয়েছিলেন, তিনি নিজেই সেই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। এই অভিযোগও নতুন নয় যে, ব্যাংক থেকে যে ঋণ দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে বোর্ডের প্রভাব তেমন কিছুই থাকে না। ঋণ প্রদানের মতো এত বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে গোপনে এবং এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবই বেশি কাজ করে। যে কারণে চেয়ারম্যানের অদল-বদলেও লাভ হচ্ছে না। ব্যবস্থার পরিবর্তন না করলে কোনোই সুফল মিলবে না। একই সঙ্গে খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতেই হবে। কোনোভাবেই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঋণ দেওয়া যাবে না। আমরা এও মনে করি, বোর্ডকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। স্বচ্ছতা-জবাবদিহি কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না যদি বোর্ডগুলোকে কঠোরভাবে দায়বদ্ধ করা না যায়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হঠাৎ করে চেয়ারম্যানের আসা-যাওয়ার কারণ জনসমক্ষে পরিস্কার করা অত্যন্ত জরুরি বলেও আমরা মনে করি। জনতা ব্যাংক কিংবা অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কোনো কোনো চেয়ারম্যান নিজেই ঋণ-অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এর আগে উঠলেও পদে অদল-বদল আনা ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ব্যাংক চেয়ারম্যানের অনেকের বেপরোয়া হওয়ার কারণ কি এটাই? অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অনেক ক্ষেত্রেই নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সৃষ্ট অবস্থার দায় পরিচালকরাও এড়াতে পারেন না। আর্থিক খাতে ক্রমাগত যে হারে ঝুঁকি বাড়ছে তা দেশের জন্য অশনিসংকেত বলেও আমরা মনে করি। করোনা দুর্যোগকালে একই সঙ্গে চলমান বন্যার বিরূপতায় এমনিতেই অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছে, তা সামলে ওঠা সহজসাধ্য নয়। নিকট অতীতেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির উজ্জ্বল চিত্র আমাদের সামনে আশার নতুন দিগন্ত খুলে দিলেও সবকিছু হতাশায় রূপ নেয় খেলাপি ঋণের চিত্র ক্রমবৃদ্ধির কারণে। এই কারণ একটি বড় দুষ্টচক্র সৃষ্ট তাও সহজেই অনুমেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ব্যবস্থাপনাগত আরও সংস্কারও জরুরি। তা না হলে ব্যক্তির অদল-বদলে সুফলের আশা করা দুরাশারই নামান্তর। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠা ও সততা থাকলে সুফল প্রাপ্তির পথ মসৃণ হতে পারে এর কিঞ্চিৎ দৃষ্টান্ত মিলেছিল অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে স্বেচ্ছাচারিতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপসহ নেতিবাচক সব রকম কর্মকাণ্ডের নিরসন ঘটাতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। এ কথা বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেকেরই হয়তো স্মরণে থাকার কথা, রাতারাতি বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের দুষ্টচক্রের বলয়মুক্ত করতে সরকারকে কঠোর হতেই হবে।