বানভাসিতে ঈদ

ঈদুল আজহা

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

কামরুল ইসলাম চৌধুরী

ঈদ আসছে করোনা মহামারির আকালে, আতঙ্ক দেশজুড়ে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে বানভাসিতে এখন ২৫ ভাগের বেশি এলাকার মানুষ। এমন নিরানন্দ বন্দি ঈদ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া আর কখনও আসেনি। না পারছি এখন করোনা সামলাতে, না বন্যার তোড়ে ভাসা কোটি কোটি হতদরিদ্র মানুষকে রক্ষা করতে।
পূর্বাভাস বলছে, ২৯ জুলাই থেকে আরও পাঁচ-সাত দিন উজানে ভারি বৃষ্টি হবে। তার অর্থ হলো ইতোমধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় উজান থেকে আরও পানি আসবে। বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। ঈদের আগে সুখবর নেই। ঘরের চালে, উঁচু বাঁধের ওপর, কলাগাছের ভেলায় বা আশ্রয়কেন্দ্রে এবার অনেক জলবন্দি মানুষকে ঈদের দিন কাটাতে হবে। কার্তিকের মঙ্গা এবার উত্তরাঞ্চলে আবার ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন জরুরি কর্মসূচি হাতে নেওয়া। দরকার সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। জলবন্দি হতদরিদ্র মানুষের জন্য খোরাকির ব্যবস্থা আর কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি জরুরি।
আমরা জানি, নদীমাতৃক বাংলাদেশে ফি বছর ২০ থেকে ২৫ ভাগ এলাকা ডুবে যায় ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে। আবহমানকাল থেকে এদেশে এটাই স্বাভাবিক। সেই বন্যার সঙ্গে আমরা বসত করতে জানি। তবে তা ২৫ ভাগের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে যখন যায়, তখনই তা আমরা আর সামাল দিতে পারি না। বন্যার স্থায়িত্বকালও এক সপ্তাহের বেশি হলে তা আমাদের জন্য সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এ ধরনের বন্যা আমাদের দেশে দুই-তিন বছর পর পর আসে। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে আমরা দেখছি ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নিয়মিতভাবে বড় বন্যা হচ্ছে। এ বছরও স্থায়িত্বের দিক থেকে ১৯৯৮ সালের পর সবচেয়ে বড় বন্যা হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করেছেন পানি বিশেষজ্ঞরা।
বন্যা বাড়ছে মূলত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়ছে। বৃষ্টি বাড়ছে। আবার ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পলি পড়ার পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়ছে। ফলে নদীগুলোর পানিধারণ ক্ষমতা কমে আসছে। নদীর খোল সরু হয়ে যাচ্ছে। শাখা নদীর মুখ কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে অথবা সরু করে ফেলা হয়েছে। এ কারণে উজানের ঢল এলেই তা দ্রুত বন্যায় পরিণত হচ্ছে। ড. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে বুয়েটের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, সামনের দিনে ব্রহ্মপুত্রে বৃষ্টি ও পলি পড়ার পরিমাণ বাড়বে। ফলে আমাদের হয়তো প্রায় প্রতিবছরই এ ধরনের বন্যার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও সুপারিশ করা হয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা বা সমাধানের চিন্তা করতে চাইলে বুঝতে হবে, প্রাকৃতিক কারণেই শুধু বন্যা বাড়ছে না, আমাদের কারণেও দেশে বানভাসি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন তো কার্বন ব্যবহারসহ মানুষের নানা তৎপরতার কারণেই হচ্ছে। তার ওপর আমরা নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে নানা অবকাঠামো নির্মাণ করেই চলেছি। স্বাধীনতা-উত্তর এই ৪৯ বছরে আমরা উপকূলীয় বেড়িবাঁধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দিয়েছি, উজানে বন ধ্বংস করেছি, অপরিকল্পিতভাবে দ্রুত নগরায়ণসহ নানা কারণে নদী অববাহিকাগুলোতে হরেক রকমের পরিবর্তন ঘটিয়েছি। এর ফলে বাড়ছে বন্যা। সামাল দেওয়া যাচ্ছে না সে বন্যা। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক অধ্যাপক ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ কয়েক বছর আগে দুঃখ করে বলেছিলেন, আমরা রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে আমাদের প্রাকৃতিক জলনিস্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছি। এখন ডুবছি বন্যায়, নাকাল হচ্ছি জলাবদ্ধতায়।
পানি বিশেষজ্ঞরা এ দেশে বন্যার সময়কাল বৃদ্ধির জন্য নদীর মধ্যে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণকে অনেকটা দায়ী করেন। এখানে নদীতে সাত হাজার ৫৫৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে। নদীগুলোতে সাত হাজার ৯০৭টি পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। তিন হাজার ২০৫টি নিস্কাশন নালা নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখতে হলে আমাদের নদীগুলোকে নিয়মিত ও সঠিকভাবে খনন করতে হবে। উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে যৌথ নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার আরও উন্নতি ও আধুনিকায়ন করতে হবে। আর বন্যা ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবন বাঁচানো।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের বন্যা অবকাঠামোগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অবকাঠামো নির্মাণভিত্তিক সমাধান সব সময় কাজ করছে না। কারণ, এসব অবকাঠামো আমাদের নদীগুলোর প্রাকৃতিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে বন্যার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে বাড়িয়ে দিয়েছে। আর বন্যানিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের এখানে মূলত বড় শহর, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তারও দরকার আছে। কিন্তু আমাদের গ্রামের মানুষ কীভাবে বন্যার সঙ্গে বসবাস করবে, তার একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা আমাদের করতে হবে। আগে আমাদের এখানে বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর মানুষ বাড়িঘর উঁচু করে নির্মাণ করত। বন্যা এলে যাতে বাড়িতে পানি ঢুকতে না পারে। এখন সেটি আমরা দেখছি না। সেটি করতে হবে। নদী-খাল ও অন্যান্য জলাশয়ের মধ্যে যে আন্তঃসংযোগ ছিল তা পুনরায় স্থাপন করতে হবে। শুধু অবকাঠোমা নির্মাণ করে বন্যা মোকাবিলা করা যাবে না।
বাংলাদেশে বন্যার ধরন ও পরিবর্তন নিয়ে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নন্দন মুখার্জির কথা হলো- গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকায় প্রায় ৫০০টি বাঁধ, ব্যারাজ ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। সেগুলো পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। প্রায় সব অবকাঠামোই চীন, ভারত ও নেপালে। সেই দেশগুলোতে বন্যা ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশে তিন সপ্তাহ ধরে চলছে। আরও ১০ থেকে ১৫ দিন চলবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
কারণ- ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সেই কথা। মনে পড়ে ১৯৮৭ আর ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর চলছিল তোড়জোড়। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বন্যা আর পানি কারবারিরা তখন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ফ্লাডলাইট অ্যাকশন প্ল্যান-ফ্যাপ তৈরিতে উৎসাহী। তবে বন্যাপীড়িত মানুষ ছিল তার বিরুদ্ধে। সে সময় ব্রিটিশ আমলে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার আত্মচরিতে ১৯২২ সালে উত্তরবঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের বন্যা সম্পর্কে যে আপ্তকথা বলেছেন, তার উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি! আচার্য মহাশয় লিখেছেন, 'প্রজাদের আবেদন গ্রাহ্য করিয়া যদি রেলওয়ের সংকীর্ণ কালভার্টগুলো বড় সেতুতে পরিণত করা যাইত, তবে এই বন্যা নিবারণ করা যাইত।... সম্প্রতি প্রসিদ্ধ জলশক্তি বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার স্যার উইলিয়াম উইলকক্স যেসব বক্তৃতা করিয়াছেন, তাহার দ্বারা বাঁধ নির্মাণ করিবার অসারতা প্রমাণিত হইয়াছে।'
ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকা ১৯২২ সালের সেই বন্যা নিয়ে লেখা এক রিপোর্টেও মন্তব্য রেখেছিল, বন্যার জন্য দায়ী নদী নয়, অতিবৃষ্টি নয়, দায়ী ব্রিটিশের তৈরি রেলপথ। স্থপতি ড. বেল্টলিকের মন্তব্য ছিল এ রকম, যেসব প্রকৌশলী ওই অঞ্চলে জেলা বোর্ড ও রেলওয়ের রাস্তাগুলো নির্মাণ করেছেন, তারা এ দেশের স্বাভাবিক পানি নিস্কাশনের পথগুলোর কথা ভাবেননি। বন্যার জন্য দায়ী বাংলার নদনদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বিঘ্নকারী রেলপথগুলো। এখন যোগ হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়ক আর বক্সকালভার্ট। নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণের ফলে শাখা নদনদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে নদনদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে বালুতে ঢেকে ও মজে মৃতপ্রায় হয়ে যায়।
তার চমৎকার বিবরণ মেলে দ্য চেঞ্জিং ফেস অব বেঙ্গল ও স্টাডি অব রিভারাইন ইকোনমি নামের দুটি গ্রন্থে। রচয়িতা রাধা কমল মুখার্জি ১৯৩৮ সালে লিখেছেন, 'সকলের অলক্ষ্যেই বদলে যাচ্ছে নদীমাতৃক বাঙলার চিত্র। এখন শীতের শেষে সব নদী শুকিয়ে যায়। দামোদর, কাঁসাই, অজয় বা ময়ূরাক্ষীকে দেখলে মনে হয় মরুভূমি। এপ্রিল মাসে বালির মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ক্ষীণ ধারাও হারিয়ে যায়। একই চেহারা উত্তরবঙ্গের করতোয়া, আত্রাই, পুনর্ভবাসহ অনেক নদীর। কুড়িগ্রামে ৫০টি আর রংপুরে দেড় শতাধিক নদনদী উধাও করে দিয়েছি।'
গোটা বাংলাদেশে কত নদী-খাল-বিল-জলাভূমি আমরা গোগ্রাসে খেয়ে এখন খুঁজছি বন্যা আর জলাবদ্ধতার কারণ! কবিগুরুর 'আমাদের ছোটনদী... বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে'- এখন আর আমাদের রূপসায় বাংলার চিরন্তন চিত্র নয়। আমরাই তা আর সেভাবে রাখিনি আমাদের অদূরদর্শী পরিকল্পনা, অব্যবস্থাপনার কারণে।
আমাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জন-অংশীদারিত্বমূলক বন্যা মোকাবিলায় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া। যে বিষয়টিতে সবচেয়ে জোর দিতে হবে, তা হচ্ছে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব মাথায় রেখে এখানে বন্যা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। আগামী ১০০ বছরে আমাদের নদী অববাহিকাগুলোতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে তা মাথায় রেখে অবকাঠামোগুলোকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, নদীর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। আর বন্যা ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করে কোনো উদ্যোগ নিলে তা সফল হবে না। বদ্বীপ পরিকল্পনাকে জনবান্ধব করতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা জনগণের মতামত নিয়ে তৈরি করতে হবে। বন্যার সঙ্গে বসতির কৌশল রপ্ত করতে হবে।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব ও সভাপতি বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম