দেড়শ' কোটি টাকার বই...

প্রাথমিক শিক্ষা

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অসীম সাহা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকীকে মুজিববর্ষ হিসেবে উদযাপনের লক্ষ্যে এ বছর সরকারের অনেক কার্যক্রমের ফাঁক গলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বই কেনার একটি গোমর ফাঁক হয়ে যাওয়ায় আপাতত তারা কেনার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। এটা যে সহজে হয়নি, তার প্রমাণ তাদের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কৌশলের মধ্যে নিহিত। সন্দেহ নেই, অধিদপ্তর কাজটি বিনা দরপত্রে তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু খবরটি বাইরে চলে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেমন, তেমনি পত্রপত্রিকাতেও এ নিয়ে প্রবল সমালোচনা হতে থাকে। দেশের খ্যাতিমান লেখক ও প্রকাশকরা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বই কেনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। প্রতিবাদ শুধু এ জন্য নয় যে, তারা খোলা দরপত্র না দিয়ে কৌশলে ১৫০ কোটি টাকার বই কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। প্রাথমিক স্কুলগুলোতে প্রদানের জন্য এক একজন লেখকের প্রতিটি বই ৬৫ হাজার কপি করে কেনার সিদ্ধান্তে লেখক-প্রকাশক উভয়েই খুশি হয়েছিলেন এবং সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে যখন দেখা গেল, তালিকায় বহু ভুয়া ও মনগড়া লেখকের অন্তর্ভুক্তির আধিপত্য, তখন তারা প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য হলেন। প্রতিবাদ এ জন্যও যে, পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। তা না হলে তারা বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দেশের খ্যাতিমান লেখক-কবিদের বাদ দিয়ে অখ্যাত লেখকদের নির্বাচন করতে পারত না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাছাইকৃত লেখকদের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা গেছে এমন সব লেখকের নাম, যাদের অস্তিত্ব শুধু খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। সম্ভবত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা ছাড়া দেশের খ্যাতিমান লেখক-প্রকাশকরা জীবনেও তাদের নাম শোনেননি। এমনকি দেশের সচেতন পাঠক সমাজের কেউ তাদের নাম কখনও শুনেছেন বলে মনে হয় না।
এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন, 'সঠিক প্রক্রিয়াতেই বই ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তালিকায় কোনো লেখকের নাম যদি বাদ পড়ে থাকে, তাহলে তিনি বা তার প্রকাশক বই জমা দিতে পারেন। অধিদপ্তর সেগুলো ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে দেখবে।' এ ধরনের কথা অধিদপ্তরের অস্বচ্ছতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। তিনি কী করে ভাবলেন, প্রকাশ্য বা খোলা দরপত্র আহ্বান না করার পরও তার মুখের কথায় আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন দেশখ্যাত লেখক বা প্রকাশকরা এভাবে বই জমা দেবেন? তার কথামতো বই কেনার প্রক্রিয়া যদি এতই স্বচ্ছ হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কেন বই কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত করলেন? আসলে মহাপরিচালক যে কথাটি বলেছেন, তাতে লেখক-প্রকাশকদের প্রতিবাদটিই যে সত্য, তা-ই প্রমাণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নিজেদের প্রক্রিয়াটিকে জায়েজ করার জন্য তিনি ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা লেখকদের নামের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তাদের দু-একজন নিকটাত্মীয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করে পার পেতে চেয়েছিলেন। সন্দেহ করা কি অযৌক্তিক হবে, যেসব অজ্ঞাত নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাদের বই কেনার কথা বলা হলেও বাস্তবে হয়, তা না কিনেই তার জন্য কয়েক লাখ টাকা খরচ করা হতো; না হয় অজ্ঞাত নামের লেখকদের লাখ লাখ টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো? করোনার এই দুর্যোগকালে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে সরকার যেখানে জেরবার, সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায় সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার জন্যই কি ১৫০ কোটি টাকার বই খোলা দরপত্র না দিয়েই গোপনে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? ব্যাপারটিকে সিরিয়াসলি নিয়ে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে দেখা জরুরি।
শোনা যাচ্ছে, বই ক্রয়ের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার আগেই কাউকে কাউকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এক একজন লেখকের এক একটি বই ৬৫ হাজার কপি করে কিনে প্রাথমিক স্তরের স্কুলগুলোতে বিতরণ করা হবে, সেখানে বই মানসম্মত এবং প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপযোগী না হলে সরকার যে উদ্দেশ্যে এত বড় অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভেস্তে যাবে। জাতির পিতাকে জানা ও তার জীবনের সংগ্রামী ইতিহাসের প্রতিফলন যেসব বইতে আছে, তা না কিনে যদি যেনতেন প্রকারে মানহীন বই কেনা হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বই কেনার একটি প্রক্রিয়া আছে। সেখানে দেশের খ্যাতিমান লেখক, প্রকাশক ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যকে নিয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। তাদের পরামর্শ মতো পরবর্তী সময়ে খোলা দরপত্রের মাধ্যমে বই জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং পরে বাছাইকৃত বই কেনা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানে না, তা হতেই পারে না। তার পরও এসব প্রক্রিয়ার কোনো কিছুই অনুসরণ না করে বই কেনার যে সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে, তা সরকারি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছু নয়। শুধু তাই নয়, এর নেপথ্যে যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই, তাই-বা কী করে বলা যায়?
তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির মূল উৎপাটনে আপনি যে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ ক্ষেত্রেও আপনি কঠোর হয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাতে বই ক্রয় করা হয় এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে কেউ যেন আর কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করে বর্তমান সরকারের গায়ে কলঙ্ক লেপন না করতে পারে, তার ব্যবস্থা করুন। জাতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

  কবি