পানির দেশে সাঁতার সংকট

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

ইতিহাসের অনেক গৌবরোজ্জ্বল অধ্যায়ের অংশীদার আমরা। নানা ক্ষেত্রে, নানা পর্যায়ে ছড়িয়ে আছে আমাদের এই গৌরবগাথা। ইতিহাসে নায়ক হয়ে আছেন বীর বাঙালি ব্রজেন দাশ। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে তিনি ইতিহাসের অমলিন অধ্যায় হয়ে আছেন। সেই ব্রজেন দাশের দেশের শিশুরাই শুধু নয়, বয়স্ক অনেকেরও প্রাণহানি ঘটে সাঁতার না জানায় পানিতে ডুবে। এমন মর্মন্তুদতার মুখোমুখি আমাদের হতে হয় প্রায়ই। বিশেষ করে আমাদের ষড় ঋতুর দেশ বর্ষাকালে এই মর্মন্তুদতার আরও বিস্তৃতি ঘটে। ৪ আগস্ট সমকালসহ অন্যান্য অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, দেশের ছয় জেলায় পানিতে ডুবে এক দিনে ১১ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। খাল-বিল-দীঘি-নদনদীর দেশ এই বাংলাদেশে এখন এসব কিছুরই দুরবস্থা অধিক দৃষ্টিগ্রাহ্য। আমাদের প্লাবনভূমির বিস্তৃতি ঘটেছে কিন্তু প্রাকৃতিক জলাধার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। আর ইট-পাথরের নগর-মহানগরীতে শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখার ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হচ্ছে।
শুধু শিশুরা নয়, নগর কিংবা মফস্বলে বড়দেরও অনেকেই সাঁতার জানেন না। অথচ ভূ-প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এ শিক্ষা আমাদের জন্য অপরিহার্য। নগর-মহানগরে কিংবা বড় বড় শহরে কিছু সাঁতার শিক্ষা কেন্দ্র আছে বটে কিন্তু সেগুলোতে অনেক পরিবারের শিশুরই সাঁতার শিক্ষা নেওয়া আর্থিক কারণে প্রায় দুঃসাধ্য। নগর-মহানগর কিংবা শহরের বাইরে, বিশেষ করে বিস্তৃত গ্রামবাংলায় এ ব্যাপারে সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক সুবিধাজনক হলেও অনেক অভিভাবকেরই সংরক্ষণমূলক মনোভাব কিংবা উদাসীনতা কিংবা গুরুত্ব অনুধাবনবোধের অভাব জীবনরক্ষার এই পথে এগিয়ে সাঁতার শিক্ষার ওপর তেমন কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। ভূ-প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য অনুসারে এ শিক্ষা আমাদের প্রজন্মের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় কিংবা অপরিহার্য ৪ আগস্টের মর্মন্তুদ সংবাদটি এরই সাক্ষ্যবহ। পানিতে ডুবে প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও জীবনের সুরক্ষায় সাঁতার শিক্ষার ব্যাপারে এখনও অনেক ক্ষেত্রেই বহু অভিভাবকের অনাগ্রহ নিঃসন্দেহে বিপদাশঙ্কার বার্তাই দেয়।
ইট-পাথরের নগরীতেও প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে এ শিক্ষার পথ সুগম করা কতটা বাঞ্ছনীয় প্রকাশিত সংবাদটি এ দৃষ্টিকোণ থেকেও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি সাঁতার জানত তাহলে এমন ট্র্যাজেডির শিকার হতো না। অনেক শিশু, এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও সাঁতার না জানার কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সাঁতার শিক্ষার বিষয়টি এক সময় পাঠ্যসূচিভুক্ত করা হলেও এর কার্যকারিতা নেই। প্রতিটি শিক্ষালয়ে এ ব্যবস্থা প্রয়োজনের নিরিখেই নিশ্চিত করা জরুরি। নিকট অতীতে এক সমীক্ষায় প্রকাশ, প্রতিবছর ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রায় ১৫ হাজার ছেলেমেয়ে পানিতে ডুবে মারা যায়। এই অস্বাভাবিক মৃত্যুহারে অতীব প্রয়োজন দেশের প্রতিটি স্কুলে সাঁতার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা অর্থাৎ তাদের পাঠ্যসূচির অংশ করা।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এর নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতেই হবে। গ্রামবাংলায় জনসচেতনতা বাড়িয়ে পারিবারিক জীবনে এ বিষয়টিকে জরুরি অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করাও সমভাবেই জরুরি। এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত যে, শুধু সাঁতার না জানার কারণে এত প্রাণহানি প্রতি বছর ঘটছে! এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতনতার বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সাঁতার জীবন রক্ষার একটি শিক্ষা। 'জলে না নামিলে কেহ শেখে না সাঁতার/হাঁটিতে শেখে না কেহ না খেয়ে আছাড়'- কালীপ্রসন্ন ঘোষের 'পারিব না' কবিতার এই পঙ্‌ক্তি মানব জীবনেরই যেন অংশ। সাঁতার না জানা শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলেও তা প্রতিরোধে কিংবা প্রতিকারে তৎপরতা যে দৃষ্টিগ্রাহ্য নয় তা সচেতন যে কাউকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম ও প্রধান উপাদান যেহেতু শিক্ষার্থী সেহেতু তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া উচিত এবং তা কালক্ষেপণ না করে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে সাঁতার শিক্ষাকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরাও এই পথটা অনুসরণ করতে পারি জীবনের প্রয়োজনে।
লেখক ও সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com