বেদনা ও বিরহের প্রশান্ত ছায়া

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাইফুজ্জামান

বাংলা কবিতায় কবি মহাদেব সাহা স্বতন্ত্র ধারার এক কণ্ঠস্বর। তার কবিতায় অনুভূতি, আবেগ ও জীবনের কলস্বর তীব্র। প্রেম ও প্রকৃতি যুগলবন্দি করে তিনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন। বেঁচে থাকার আকুলতা, সংগ্রাম যূথবদ্ধ সুখ-দুঃখের পাঠ কবিতার চেতনাকে সংহত করেছে। তার কবিতা জীবনালেখ্যের গভীর অনুরণনের দোলাচলে ভরপুর। হৃদয়স্পর্শী পঙ্‌ক্তিমালা অভিজ্ঞতা, জীবনযাপন ও স্বপ্নে বন্দি। নিত্যদিনের ঘটনা, দৃশ্যমান জগতের ভেতর অবগাহন শেষে একজন প্রকৃত কবি তুলে আনেন জীবনাভিজ্ঞতার উপাদান। কবিতায় ধরা পড়ে কবির বিচিত্র বোধ যা শব্দ ও বাক্যে গ্রথিত হয়। এ সবকিছু মা, মাটি, মানুষ যার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কিত।
মানব-মানবীর সংবেদনশীলতায় সৃষ্ট জীবন রহস্যের গাঢ় আবেদন কবিতার অন্তর্গত ভূমিকে আর্দ্র করে তোলে। মহাদেব সখেদে যা উচ্চারণ করেন তার মধ্য থেকে আমাদের চেনা জগৎ খুঁজে পাওয়া যায়। 'এই গৃহ, এই সন্ন্যাস' কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে তার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় পরিণত। কবিতা দর্শন ও জীবনের টানাপোড়েন শুদ্ধ সুষমার জন্ম দেয়। মহাদেব আধুনিক। তার কবিতায় মানবিক সম্পর্ক, বেড়ে ওঠা ও সময় অতিক্রমণের জীবন্ত গাথা যেন সৌন্দর্যের আধার। নিত্যদিন দেখা, কথাবার্তা আর ভাব বিনিময়ের মধ্যে প্রেম জাগ্রত থাকে। প্রেমাস্পদের স্পর্শে ধন্য হয়ে ওঠে মন। প্রেমে বিরহ এক মৌলিক সত্তা। ফেসবুক, ইন্টারনেট, মুঠোফোনের যুগে যোগাযোগের কষ্ট কাউকে পীড়া দেয় কিনা আমরা জানি না। একসময় যোগাযোগের এই আধুনিক মাধ্যম ছিল না। তখন 'চিঠি' ছিল মনের ভাব আদান-প্রদানের প্রতিনিধি। প্রেমের আকুতি ছিল। প্রেমিক কত আবেগে উচ্চারণ করেছে :
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/আঙুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলে তাও,/ এটুকু সামান্য দাবী চিঠি দিও, তোমার শাড়ীর মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। [ চিঠি দিও ]
মহাদেবের কবিতায় প্রকৃতি ও প্রেম একাকার হয়ে আছে। দয়িতা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন তিনি প্রকৃতির কাছে আশ্রয় চাইবেন। একজন মানস প্রতিমার আঁচলই হতে পারে প্রেমিক কবির আশ্রয়স্থল। ব্যথিত কবি সেবাশ্রম, স্বাস্থ্য নিবাস ছেড়ে মানসীর কাছে পরম শান্তি ও স্বস্তির জন্য পৌঁছে যাবেন।
শ্রাবণে অবগাহিত মহাদেব 'শ্রাবণ' বন্দনায় মুখর। তার কবিতা অশ্রুসজল বিধুর। গ্রামে তার জন্ম। সে কারণেই বোধ হয় বুকের ভেতর এক অনন্ত শ্রাবণকে তিনি ধারণ করেছেন। মহাদেব তার আবেগ, অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রকৃত কবির দুঃখ-কষ্টে লীন হয়ে আছেন। প্রকৃতি, নদী, মানুষ, বর্ষা তার কবিতায় বার বার ফিরে আসে। স্মৃতি, গ্রাম, মন কেমন করা প্রহর নিয়ে অঝোর শ্রাবণ ধারায় মহাদেব শেকড় সংলগ্ন হয়ে পড়েন। ব্যস্ততার ভিড়ে এই শহর কিংবা প্রবাসে তার গ্রাম স্মৃতি ফুঁড়ে ওঠে। সঙ্গত কারণে নদীর কাছে পাওয়া, না পাওয়ার গল্প বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
নারী ও প্রকৃতি, প্রেম আর কাতরতা মহাদেবের কবিতায় স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সংযোজিত। তিনি একদিকে বাউল, অন্যদিকে প্রেমিক ও আগন্তুক। মহাদেব সাহা শীর্ষ কবি। তার কবিতায় যাপিত জীবনের যন্ত্রণা ও আনন্দ প্রকাশিত। প্রায় ৮০ খণ্ডের কাব্যগ্রন্থে নিরন্তর প্রণয়-বিরহ, সংগ্রাম ও রক্তাক্ত হওয়ার বিবরণ বিধৃত। এ সত্যগুলো আমাদের বলতে হবে।
ধ্বংসের মধ্যে সৃষ্টি উল্লাস তার অন্বেষার বিষয়। শেকড়-লগ্ন কবি প্রকৃতি, মানুষ, জন্ম গ্রামে ফিরে যাওয়ার আর্তি প্রকাশ করেন। তার যাত্রা ইতিহাস, ঐতিহ্য, বীরযোদ্ধা আর জন্মভূমির সোনালি দিনের দিকে। মহাদেব ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিশেষ করে পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ ঘটনা- জাতির পিতার হত্যা-পরবর্তী ঘটনা আপন যত্নে কবিতার অংশ করেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সামরিক শাসন, স্বৈরাচারের অগণতান্ত্রিক কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু মহাদেবকে ব্যথিত করেছে। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ উচ্চকিত হয়েছে।
মহাদেব সাহা আত্মজৈবনিক কবি। তিনি কবি হয়েছেন অনুভূতিপ্রবণ মনন ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অভিঘাতে। তার জীবনে যেমন অপার আনন্দ আছে, তেমন রয়েছে বেদনা ও বিরহের প্রশান্ত ছায়া। সমাজের অবক্ষয়, মানবিক বিপর্যয়, সমাজ ব্যবস্থার অসমতা ও মানুষের অন্তর্গত বোধ তাকে কবি হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করেছে। তার অভিজ্ঞ বাণীমালা মহাকালের গর্ভে গভীর চিহ্ন রেখে যেতে বাধ্য, নির্দি্বধায় বলা যায়। কবি মহাদেব সাহার ৭৬তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।
  উপ-কিপার, বাংলাদেশ
জাতীয় জাদুঘর