ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র থেকে ধর্মরাষ্ট্র?

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ববি নাকভী

ভারতের অযোধ্যায় 'রামমন্দির'-এর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রামমন্দির ভারতের সমসাময়িক রাজনীতির মূল উপজীব্যে পরিণত হয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে দলগুলোর উত্থান-পতনে এই ইস্যু সূদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখে চলেছে।
মোদির সফরের মধ্য দিয়ে ১৬০ ফুট নতুন রামমন্দিরের নির্মাণকাজের সূচনা হবে অযোধ্যার যে স্থানটিতে, গত এক শতক ধরে ওই স্থানটি নিজেদের বলে দাবি করে আসছিল হিন্দু ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা। বিবাদপূর্ণ ওই স্থানটিকে ঘিরে ভারতজুড়ে এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা ও রক্তপাতও ঘটেছিল।
আজ ওই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। আজ থেকে ৯ মাস আগে ভারতের শীর্ষ আদালত এই বিতর্কিত স্থানটি হিন্দুদের হাতে তুলে দেন এবং মসজিদ তৈরির জন্য মুসলমানদের অন্য একটি জমি প্রদানের নির্দেশ দেন।
এই রায় প্রদানকারী ভারতের সাবেক প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসর গ্রহণের পর মোদির প্রস্তাবে রাজ্য সভা হিসেবে (অনির্বাচিত) শপথ গ্রহণ করায় বিচারিক স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বাবরি মসজিদ ১৬ শতকে স্থাপিত হয়েছিল এবং ১৯৯২ সালে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা মসজিদটি ধ্বংস করেছিল। ওই সময় সংঘর্ষে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এখন বাবরি মসজিদের স্থানেই নতুন মন্দিরটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
আয়োজকরা বলছেন, অনুষ্ঠানে বৈদিক রীতি জড়িত থাকবে এবং মন্দিরটি সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হবে। এটি সত্য যে, অযোধ্যা রায় ঘোষণার কয়েক মাস আগে থেকেই মুসলমানদের একটি বড় অংশ এই বিতর্কিত জমির দাবি ছেড়ে দিয়েছিল। ২০১৪ সালে বিজেপির বিজয় ও সাম্প্রদায়িকতার ঘটনাগুলো ভারতীয় মুসলমানদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে।
মুসলমানরা এখন বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারীদের শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন। বিজেপি নেতা এল কে আদভানি রাম মন্দির আন্দোলনের জনক হিসেবেও গণ্য হয়েছিলেন।
মন্দিরটি নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের দশকে শুরু করা সাংস্কৃতিক-জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমাপ্তি টানছে মোদির বিজেপি। বিজেপির প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহারে রামমন্দির স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল। বিগত সময়ে দলটির রাজনৈতিক কৌশলও আবর্তিত হয়েছে রামমন্দির আন্দোলনকে ঘিরে। এর মাধ্যমে বিজেপি ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র থেকে সংখ্যাগুরু ধর্মাবলম্বীদের প্রজাতন্ত্র বানানো হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মুসলমানরা নিগৃহিত হচ্ছে।
লখনৌয়ের একটি বিশেষ আদালতে আদভানি ও বিজেপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা ও মসজিদ ধ্বংসে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। গত ২৪ জুলাই ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে আদালতে হাজির হয়েছিলেন আদভানি (৯২)। শুনানিকালে তিনি ১০০টি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
রামমন্দিরের ভিত্তি স্থাপন অনুষ্ঠানে আদভানিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট লখনৌয়ের বিশেষ আদালতকে ৩১ আগস্টের মধ্যে মামলাটির রায় ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভিত্তি স্থাপনের তারিখ ও মোদির উপস্থিতি নানা জটিলতার সৃষ্টি করেছে। বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট হিন্দু ধর্মীয় নেতা ৫ আগস্টকে অশুভ দিন বলে অবহিত করেছেন। আর মুসলমানরা মনে করছেন লখনৌয়ের আদালত থেকে প্রত্যাশিত রায় আসবে এবং মসজিদ ভাঙায় জড়িতদের শাস্তি হবে। কিন্তু তার আগেই মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করা হচ্ছে।
এ ছাড়া, ৫ আগস্ট ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক আধিকার কেড়ে নেওয়ার অত্যন্ত বিতর্কিত পদক্ষেপটির প্রথম বর্ষপূর্তি। গত বছরের এই দিনে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় মোদি সরকার।
ভারতকে সংখ্যাগুরু ধর্মাবলম্বীদের রাষ্ট্রে পরিণত করতে বিজেপির সুদূরপ্রসারী কর্মসূচির অংশ ছিল সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ করা। একই ধরনের বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত ভারতের উত্তর-পূর্বের অন্য রাজ্যগুলোর দিকে মোদি সরকার হাত বাড়ায়নি। ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কাশ্মীরের মুসলমানরা লকডাউনের মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের চলাফেরায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে এবং সর্বোপরি তাদের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে।
কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিসহ ওই রাজ্যের বিশিষ্ট নেতারা আটক রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ কয়েক মাস কারারুদ্ধ থাকার পর নীরব থাকার শর্তে মুক্তি পেয়েছেন।
৫ আগস্ট মোদি যখন মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন, তখন তিনি ২২ দশমিক ছয় কেজি ওজনের একটি রুপার ইটে লাল কালিতে নিজের নাম অঙ্কন করবেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি হয়তো ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি টানবেন।
সরকার-সমর্থিত অযোধ্যা ট্রাস্টের ঘোষণা অনুসারে, তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৪ সালে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ হবে। ওই সময় মোদির সামনে আরেকটি নির্বাচনী সুযোগও আসবে। এর মধ্যে স্বেচ্ছাসেবকরা দেশজুড়ে মানুষের কাছ থেকে মন্দির নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করবেন। আর ২০২১ সালে রাজ্য নির্বাচন ও তার পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে রামমন্দিরের নির্মাণকাজ।
ভারতীয় হিন্দুদের জন্য রামমন্দির নির্মাণ বড় অর্জন এবং কয়েক দশকের পুরোনো স্বপ্ন পূরণের সময়। অথচ ভারতীয়রা সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক জাতি।
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, মোদি শাসনামলে মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণের বড় মূল্য দিতে হবে। ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এই অধ্যায়টি বন্ধ করতে চায় এবং ৩১ আগস্ট লখনৌয়ের আদালতের রায় নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়।
রায়ে আসামিরা দোষী সাব্যস্ত না হলেও যে তারা মন্দিরের অংশ স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেবে এমন সম্ভাবনা ভারতীয়দের উদ্বিগ্ন করে।
গালফ নিউজ থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর সাইফুল ইসলাম

বিষয় : প্রতিবেশী