চামড়ার বাজার

কথার বদলে কাজ দেখান

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

সরকারি উদ্যোগে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ, রপ্তানির অনুমতি, ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে অর্থের ব্যবস্থা করার পরও চামড়ার দামে বিপর্যয় বিস্ময়কর। সরকারি দামের অর্ধেকেও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। যেখানে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে আগেভাগেই এ বছর চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় কমিয়ে ধরে নতুন দাম নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; সেখানে এ অবস্থা কেন সৃষ্টি হলো? চামড়ার আড়তদার বলছেন এক কথা, আবার ট্যানারি মালিকরা বলছেন আরেক কথা। আবার কেউ বলছেন পুরোনো সিন্ডিকেটের কথা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পর সে অনুযায়ী চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করতে মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে বলে আমরা মনেকরি। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, চামড়ার দাম নিশ্চিত করতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা সার্বিক সহায়তা করবেন এবং যে কোনো মূল্যে গতবারের মতো পরিস্থিতি হতে দেবেন না। বাস্তবে আমরা দেখেছি তার উল্টা চিত্র। এবার করোনা ও বন্যা দুর্যোগের মধ্যেই অনুষ্ঠিত ঈদুল আজহায় যতটা কম পশু কোরবানি হবে- ধারণা করা হয়েছিল; বাস্তবে তার চেয়েও বেশি কোরবানি হয়। এটা সত্য যে, বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনার কারণে চামড়ার চাহিদা কম। তার ওপর ট্যানারি মালিকরা বলছেন, গত বছরের চামড়াই তারা এখনও বিক্রি করতে পারেননি। আন্তর্জাতিক চাহিদা কম থাকা এবং এ বছরের শুরু থেকেই করোনা দুর্যোগ শুরু হওয়ায় সংশ্নিষ্ট দেশে তারা চামড়া পাঠাতে পারেননি। তারপরও এখনও দেশে ও বিদেশে চামড়ার যে চাহিদা রয়েছে, তাতে চামড়ার মূল্য এভাবে পড়ে যাওয়া কতটা সঙ্গত- সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আমরা জানি, কোরবানির সময়েই ট্যানারি মালিকরা ৬০ ভাগ চামড়া সংগ্রহ করে। কোরবানিদাতা থেকে বিশেষত মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করেন। গতবারের মতো এবারও এসব মাদ্রাসা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েন। বিস্ময়কর যে, চামড়ার জোগান ও চাহিদার নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ফলে দেশি চামড়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়লেও চামড়া বাজার অস্থিতিশীলই থেকে গেছে। দুই বছর ধরে অস্থিতিশীলতার চরম প্রকাশ দেখছি আমরা। এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থায় যেসব সমস্যা থাকে- যেমন বাজারদর, সিন্ডিকেট; সেগুলো আগে কখনও এতটা ছিল না। বিষয়গুলো অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার কারণে সার্বিক চামড়ার চাহিদা কমেছে বটে, তবে করোনাপরবর্তী সময়ে চামড়া শিল্পের উত্থান এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে ট্যানারিজাত হয়ে জুতা, জ্যাকেট, ব্যাগ তথা চামড়াজাত পণ্য তৈরি পর্যন্ত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ এই খাতের সঙ্গে জড়িত। আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তিনির্ভর খাত হিসেবে একে গড়ে তুলে ট্যানারি শিল্পের মালিকদের সমন্বয়ে রপ্তানি গিল্ডের 'প্রাইস সেন্টার' গঠন করে চামড়ার নূ্যনতম মূল্য নির্ধারণ করা গেলে চামড়া শিল্প রক্ষা; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে ট্যানারি শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য যেমন নূ্যনতম মজুরি, নিরাপত্তা ও মানবিক ব্যবস্থা করা প্রয়োজন; একই সঙ্গে ট্যানারি মালিকদের ব্যাংক ঋণ, রপ্তানি সুবিধাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা দরকার। গত বছর কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। এ বছর সে রেকর্ডও ভঙ্গ হলো। দাম না পেয়ে গতবার অনেকে পশুর চামড়া নদীতেও ফেলে দেয়। এবারও চামড়া নষ্ট হওয়ার খবর এসেছে। বিষয়টি দুঃখজনক। এ ক্ষেত্রে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে- ভুলে যাওয়া চলবে না। আমরা যদি প্লাস্টিক, র‌্যাকসিন বা কৃত্রিম চামড়ার মতো উপাদানে তৈরি জুতা বা ব্যাগ ব্যবহার কমাতে পারি, তাহলে চামড়ার অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিশ্চয় বাড়বে। সবকিছুর আগে জরুরি কারসাজি বন্ধ করা। আমরা দেখছি, কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে আলোচনা অনেক হয়েছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এখন কথার বদলে কাজ দেখতে চাই।