বিগত দশ বছরে স্বাস্থ্য খাতের অর্জন খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনেক সাফল্য রয়েছে আমাদের, সেটি যেমন এই করোনার সময়ে, তেমনি আগেও। আগে দেশে হাসপাতাল ছিল হাতেগোনা। বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় হাসপাতাল হয়েছে
সমালোচনা যদি সত্য উদঘাটনের জন্য হয় এবং এর তীর ভেদ করে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার লক্ষ্যমাত্রা, তাহলে সেই তীরের আঘাত যতই বেদনাদায়ক হোক, সেটি সহ্য করা উচিত। সম্প্রতি আমাদের স্বাস্থ্য খাত কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির কারণে যে দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে, তা কারও কাম্য ছিল না। কিন্তু এটি ঘটেছে এবং ঝড় বয়ে গেছে সমালোচনার। তবে এই সমালোচনা যদি শুধুই সমালোচনার জন্য হয়, তবে সেটি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন-অর্জনকে ভূলুণ্ঠিত করবে।
বিশ্বের ছোট-বড় প্রতিটি দেশ করোনা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া সত্ত্বেও করোনায় আমাদের মৃত্যুহার বিশ্বের সবচেয়ে কম আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। পার্শ্ববর্তী ভারতের অবস্থাও নাজুক। সেই হিসেবে আমাদের অবস্থা ভালোই বলতে হয়। যদিও কেউ কেউ বলছেন, টেস্টের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছি না।
এটাও সত্য, করোনা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তা সম্ভব হয়েছে সরকারের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিভিন্ন উদ্যোগ তথা পদক্ষেপের কারণে। বিশেষ করে সময় মতো সচেতনতা তৈরিসহ প্রয়োজন অনুযায়ী লকডাউন তথা বিধি-নিষেধ আরোপের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোই এক্ষেত্রে বেশি কাজে দিয়েছে। সরকার কর্মস্থলে মানুষের অংশগ্রহণকেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক করোনা পরিস্থিতির বিবেচনায় শিথিল ও কড়াকড়ি- এই দুই পর্বে অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে দক্ষতার সঙ্গে করেছিল। একইভাবে সরকারের কঠোর ও শিথিল লকডাউন নীতির বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে কঠোর লকডাউনের সময় সরাসরি অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের ব্যাপারটিতেও সরকার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের নির্ভয়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে কাজে নিবেদিত করার ব্যাপারটিও এই সরকার করেছে দূরদর্শিতার সঙ্গে। এ ব্যাপারে সরকার অনতিবিলম্বে পাবলিক ও প্রাইভেটসহ সংশ্নিষ্ট সব খাতের সমন্বিত সহযোগিতার মাধ্যমে কাজটিকে এগিয়ে নিতে মাঠে নামে। এরই অংশ হিসেবে মধ্য এপ্রিলেই বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে করোনাযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা পাবলিক ও প্রাইভেট চিকিৎসকদের ১০ হাজার পিপিই প্রদানসহ কর্মস্থলে ডাক্তারদের স্বতঃস্টম্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সাফল্যের দিকগুলো তুলে ধরে অনুপ্রেরণা ও সাহস জোগানোর কাজটিও করে।
বিগত দশ বছরে স্বাস্থ্য খাতের অর্জন তথা সাফল্যগুলোকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনেক সাফল্য রয়েছে আমাদের, সেটি যেমন এই করোনার সময়ে, তেমনি আগেও। আগে দেশে হাসপাতাল ছিল হাতে গোনা। সেই অবস্থা থেকে বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় হাসপাতাল করা হয়েছে। ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে গেছে। দেশে এরই মধ্যে গুণগতমানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, মেডিকেল ইনস্টিটিউট করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রতিটি বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আট বিভাগে আটটি ক্যান্সার হাসপাতাল করা হচ্ছে। ১০ হাজার চিকিৎসক, ১৫ হাজার নার্সসহ পর্যাপ্ত জনবল প্রস্তুত করা হচ্ছে। বিগত দশ বছরে এই বিষয়সহ আরও বিভিন্ন সময়োপযোগী কার্যকর পদক্ষেপের কারণেই স্বাস্থ্য খাতে এ জাতীয় বহু অর্জন আমাদের রয়েছে।
বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের কারণেই দেশে শিশুর অপুষ্টির হার যেমন হ্রাস পেয়েছে, তেমনি কমেছে মৃত্যুর হারও। মৃত্যুর হার এখন অর্ধেকেরও নিচে। আমাদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের হার ঈর্ষণীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগের কাছাকাছি। যেমন বিসিজি টিকা প্রদানের হার ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি এবং ফলপ্রসূ। একই সঙ্গে সাফল্য রয়েছে গর্ভকালীন মাতৃমৃত্যু হারেও। মাতৃমৃত্যু হার এখন প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৭৬ জনে নেমে এসেছে। দেশের মানুষের গড় আয়ুও ৭২ দশমিক ৩ বছর, যা অন্যান্য দেশ- বিশেষ করে ইন্ডিয়া ও সাউথ আফ্রিকার তুলনায় বেশি। নিরাপদ মাতৃত্ব ও শহর-গ্রামে টিকাদান কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। দেশের স্বাস্থ্য সেবার এসব উন্নতির স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের মর্যাদাশীল পুরস্কার ভ্যাকসিন হিরো, জাতিসংঘ ডিজিটাল হেলথ-২০১১, সাউথ সাউথ, এমডিজি অর্জনসহ বহু সংখ্যক পুরস্কার বয়ে এনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।
বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে অনেক ধরনের দুর্নীতি কমবেশি ছিল এবং আছে। সেগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তবে সেটি বন্ধ করার একটি সুস্থ প্রক্রিয়া আছে। এর সমাধান অন্যান্য এজেন্সি পাঠিয়ে হবে না। মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করতে হবে। হাসপাতালে কী কী সমস্যা তারা ভালো করেই বোঝে, যা অন্যরা বুঝবে না। বেসরকারি হাসপাতালে দুর্নীতি হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেখানে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের লোক পাঠিয়ে বিষয়গুলো তদারকি করতে হবে। কিন্তু সেটি না করে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো সমাধান নয়। এতে বেসরকারি হাসপাতালের বিষয়ে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে।
১০-১৫ বছর আগেও আমাদের দেশের অনেকে হার্টের সমস্যা হলে বিদেশে যেতেন। যাদের টাকাপয়সা আছে তারা যেতেন ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরে; যাদের টাকাপয়সা একটু কম তারা ভারতের দিল্লি বা মাদ্রাজে। আর যারা একেবারেই গরিব তারাও জায়গা-জমি বিক্রি করে কলকাতায় গিয়ে ডাক্তার দেখাতেন। আমাদের দেশের প্রাইভেট সেক্টরের কিছু হাসপাতালের কারণে এসব কমে এসেছে। যদিও এই সেক্টরের সেবার মান সবার যেমন এক নয়, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ-অসন্তোষও। ফলে যাদের মান ভালো নয়, তাদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যেখানে দুর্নীতি-অনিয়ম সেটি অবশ্যই বলতে হবে। কিন্তু মানুষের কাছে যেন ভুল বার্তা যেন না যায়, সেটিও দেখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। সন্দেহের বিষয় হলো- প্রধানমন্ত্রী একা আর কতটুকুই বা করতে পারবেন! এখন সময় এসেছে যার যার নিজের জায়গা থেকে দেশের জন্য কাজ করার, দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য কাজ করার। আসুন, নিজেদের স্বাস্থ্য খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশটিকে আরও সুন্দর করে তুলি।
গণমাধ্যম সমন্বয়ক, শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন