দশম শতকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চন্দ্রবংশ নামের একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাজবংশের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায় ড. মুহম্মদ আব্দুর রহিম ও ড. আব্দুল মমিন চৌধুরীর বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে। ময়নামতিতে প্রাপ্ত তিনটি, ঢাকায় প্রাপ্ত একটি ও সিলেটের রাজনগর উপজেলার পশ্চিমভাগে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন থেকে এই বংশের শাসন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব। পশ্চিমভাগ তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, শ্রীহট্ট অঞ্চলে এই বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা শ্রীচন্দ্রের তত্ত্বাবধানে চন্দ্রপুর নামক স্থানে গড়ে উঠেছিল চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার তার বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) গ্রন্থে বলেছেন, শ্রীচন্দ্রের শাসনকাল ছিল ৯০৫-৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ। পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের তথ্যানুযায়ী খ্রিষ্টীয় দশম শতকের প্রথম ভাগে (আনুমানিক ৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ) শ্রীহট্টে একটি উচ্চতর বিদ্যাপীঠ বা মঠ গড়ে ওঠে। শ্রীচন্দ্র প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য তিনটি দানপত্রে মোট ৪০০ পাটক (১ পাটক সমান ৫০ একর) ভূমি দান করেছিলেন। প্রত্নতত্ত্ব গবেষক কমলাকান্ত গুপ্ত তার বিখ্যাত 'কপার প্লেইট অব সিলেট' গ্রন্থে পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের বক্তব্য বিশ্নেষণ ও তার লিখিত প্রবন্ধে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় উচ্চ বিদ্যাপীঠটি মহাস্থানগড় ও তক্ষশীলার মতো উন্নতমানের ছিল উল্লেখ করে কমলাকান্ত গুপ্তকে এক চিঠিতে জানিয়েছেন।

একটি ব্রহ্মার মঠ, চারটি বঙ্গাল মঠ ও চারটি দেশান্তরী (বিদেশি) মঠ  নিয়ে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। ব্রহ্মার মঠের যাবতীয় কার্য নির্বাহের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২০ পাটক জমি। বাকি আটটি মঠের জন্য ২৮০ পাটক জমি বরাদ্দ ছিল। এ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল খুবই মনোরম ও নির্মাণশৈলীর কারুকার্যে সুশোভিত। বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল সম্পূর্ণ আবাসিক। শিক্ষার্থীদের যাবতীয় খরচ কর্তৃপক্ষ বহন করত। তাম্রশাসন অনুযায়ী ব্রাহ্মণরা এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে ৩৬ জন ব্রাহ্মণের নাম পাওয়া যায়। চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল চতুর্বেদ এবং সপ্তম শতকের বৌদ্ধ ব্যাকরণবিদ চান্দ্রগোমীর চান্দ্র ব্যাকরণ। গবেষকরা অনুমান করেন, চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু শাস্ত্রবিদ্যা অধ্যয়নের পাশাপাশি চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, শল্যবিদ্যা, ধাতুবিদ্যা, হেতুবিদ্যা, শব্দবিদ্যাসহ আরও অনেক বিষয় পড়ানো হতো।

চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ আজও অনাবিস্কৃৃত। তবে পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের তথ্যানুযায়ী খ্রিষ্টীয় দশম শতকের প্রথম ভাগে উত্তরে কুশিয়ারা নদী, দক্ষিণে মনু ও অন্যান্য নদী, যেমন- খোয়াই, করাঙ্গী, বেত্রা ও বিবিয়ানা  এবং পূর্বে লাতু আদমারি (পাথারিয়া) লংলা পর্বত  এই সীমানার মধ্যে  অবস্থান ছিল। এ প্রসঙ্গে কোনো কোনো গবেষক  মৌলভীবাজার জেলার জুড়ি উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের দীড়িপাড় এলাকার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু মৌলভীবাজার জেলার বর্তমান মানচিত্র পরীক্ষা করলে এ ব্যাপারে ভিন্নমতের অবকাশ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এর অবস্থান  মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে রাজনগর উপজেলার ইন্দেশ্বর নামক স্থানে নৌঘাঁটি ছিল। ওই এলাকায় তৃতীয় দানপত্রে ৬ হাজার ব্রাহ্মণের ভূমিদানের কথা উল্লেখ আছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান যে বর্তমান রাজনগর উপজেলায় ছিল তা চারটি কারণে প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তা হলো- ১. পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনটি রাজনগর উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রামে পাওয়া যায়। ২. মঠ ব্যবহারের জন্য দানপত্রে নৌঘাঁটি রাজনগর উপজেলার ইন্দেশ্বরে অবস্থিত ছিল। ৩. দানপত্রে সহস্র ব্রাহ্মণ থেকে রাজনগরের ক্ষেমসহস্র, বালিসহস্র ও মহাসহস্র গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে। ৪. বিশ্ববিদ্যালয়টি মনু ও কুশিয়ারার নিকটে অবস্থিত ছিল।

পরিতাপের বিষয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও দীক্ষার যে বিপুল আয়োজন ছিল পরবর্তীকালে তার কোনো পরম্পরা রইল না। এটি কি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ধ্বংস  হলো? নাকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, জলবায়ুগত বা রাজনৈতিক কারণে- তা এখন পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন খননকার্যের ফলে আবিস্কৃত হয়েছে; ঠিক একইভাবে ব্যাপক খননকার্য চালিয়ে অনুসন্ধান করলে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়টির ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

  সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজ, কুলাউড়া