জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ যে কোনো ভাটির দেশের জন্যই প্রায় অব্যর্থ সুরক্ষা কবচ। আন্তর্জাতিক আইনে নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের প্রাচীন ধারণার সমর্থকরা আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্বের যে অযৌক্তিক ধারা বজায় রেখে ভাটির দেশগুলোকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়, আলোচ্য সনদটি তার বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত প্রতিবাদ। 'নদী অধিকার দিবস' পালনের মাধ্যমে সেই সম্মিলিত প্রতিবাদ আরও সংহত হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা

আমরা 'নদী অধিকার দিবস' এমন সময় পালন করছি, যখন নদনদী সুরক্ষিত থাকার প্রয়োজনীয়তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। আমরা দেখছি, প্রকৃতির প্রতি নির্বিচার অত্যাচার করোনাভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস বয়ে নিয়ে এসেছে। আমরা আগেও বলেছি, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পূর্বশর্ত হচ্ছে প্রকৃতির স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা। বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপে এক্ষেত্রে নদীর স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। কারণ এখানকার প্রতিবেশ ও পরিবেশ ব্যবস্থা ব্যাপক মাত্রায় নদীনির্ভর। এখানে নদী ভালো থাকলে প্রকৃতি ভালো থাকে। আমরা মনে করি, অন্তত কভিড-১৯ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হলেও সরকার ও সাধারণের উচিত নদীর প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়া। 'নদী অধিকার দিবস' উপলক্ষে এই দায়িত্ব আমরা আরও একবার মনে করিয়ে দিতে চাই।

নদীর প্রতি বাংলাদেশের দায়িত্বশীলতার কথা কেবল আমরা বলছি না, গত বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত এক রায়ে দেশের উচ্চ আদালত থেকেও বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে ঘোষিত ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য গত বছর এপ্রিলে প্রকাশের পর আমরা দেখেছিলাম- উচ্চ আদালত বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত সব নদীকে 'আইনি সত্তা' বা জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছিলেন। নোঙর, রিভারাইন পিপলসহ আমাদের দেশের বিভিন্ন নদী আন্দোলনের কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে যে দাবি জানিয়ে আসছিলাম, আদালতের সেই রায় ছিল তারই স্বীকৃতি। যদিও চলতি মাসে ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা এক আপিলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক রায়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কিছু নির্দেশনাকে মতামত হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তাতে করে দেশের নদনদীকে জীবন্ত বা আইনি সত্তা ঘোষণার তাৎপর্য ম্লান হয় না।

আমরা দেখতে চাই, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে দেশের নদনদী সুরক্ষায় সব পক্ষ আরও আন্তরিক ও সক্রিয় হয়েছে। কারণ প্রবহমান নদনদী আমাদের অধিকার। আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশে নদনদীর বিস্তৃত জাল প্রকৃতি প্রদত্ত উপহার। বাংলাদেশ গড়েই উঠেছে নদীর আশীর্বাদে। ভূমিগঠন প্রক্রিয়া ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ছাড়াও আমাদের সভ্যতা, সমাজ, যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা, এমনকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহুলাংশে নদীনির্ভর। ফলে নদী না থাকলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। আর তাই নদীর সুরক্ষা এদেশের আপামর জনসাধারণের সুরক্ষারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমরা দেখেছি, ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘে পাস হওয়া পানিপ্রবাহ সনদ বা ইউএন ওয়াটার কোর্সেস কনভেনশনেও মানুষের অধিকার রক্ষায় নদীর অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বস্তুত ওই সনদ বিশ্বব্যাপী কার্যকর হওয়ার দিনটিকে স্মরণ রাখার জন্যই আমরা ২০১৫ সাল থেকে ১৭ আগস্ট নদী অধিকার দিবস ঘোষণা পালন করে আসছি।

নিয়ম অনুযায়ী অন্তত ৩৫টি দেশ অনুসমর্থন করলে তার ৯০ দিন পর সনদটি কার্যকর হওয়ার কথা। ২০১৪ সালের ১৯ মে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে এ সনদ অনুসমর্থন করে। ফলে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব সনদটি পরবর্তী ৯০ দিবসের অব্যাবহিত পরে কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দেন। সেই হিসাবে ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট থেকে সনদটি কার্যকর হয়েছে।

জাতিসংঘের আলোচ্য সনদ তথা 'কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য নন-নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস' বা বাংলায় সংক্ষেপে 'জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ, ১৯৯৭' বিশেষভাবে আন্তঃসীমান্ত বা আন্তর্জাতিক বা অভিন্ন নদীর একটি বিশ্বস্বীকৃত সুরক্ষা কবচ। দুর্ভাগ্যবশত সনদটি পাসের সময় বাংলাদেশ এর পক্ষে ভোট দিলেও জাতীয় সংসদে এর অনুসমর্থন দশকের পর দশক ঝুলে রয়েছে। যদিও রিভারাইন পিপলসহ বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রথম থেকেই এই দলিল অনুসমর্থনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।

এটা ঠিক, নদী নিয়ে বিশ্বব্যাপী বেসরকারি পর্যায়ে আরও দুটি দিবস পালিত হয়। ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস এবং সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ সপ্তাহে বিশ্ব নদী দিবস। এর বাইরে রিভারাইন পিপল থেকে আমরা আরও একটি দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়ার তাৎপর্য হচ্ছে, এতে করে জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদের ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠবে। আমরা আনন্দিত যে বাংলাদেশে নদী, পানি ও পরিবেশ বিষয়ে তৎপর অন্যান্য সংগঠন ও উদ্যোগও রিভারাইন পিপলের এই দাবির প্রতি প্রথম থেকেই সংহতি প্রকাশ করে দিবসটি পালন করে আসছে। গ্রহণ করছে বিভিন্ন কর্মসূচি। যদিও করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার সীমিত পরিসরে দিবসটি পালিত হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নদী, পানি ও পরিবেশ-সংক্রান্ত সংগঠন ও উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি দেশের বাইরের উদ্যোগগুলোও আমাদের আহ্বানে সাড়া দেবে। ইতোমধ্যে তার প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সনদটি অনুসমর্থন করা হবে।

বস্তুত জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ যে কোনো ভাটির দেশের জন্যই প্রায় অব্যর্থ সুরক্ষা কবচ। আন্তর্জাতিক আইনে নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের প্রাচীন ধারণার সমর্থকরা আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্বের যে অযৌক্তিক ধারা বজায় রেখে ভাটির দেশগুলোকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়, আলোচ্য সনদটি তার বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত প্রতিবাদ। 'নদী অধিকার দিবস' পালনের মাধ্যমে সেই সম্মিলিত প্রতিবাদ আরও সংহত হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখকবৃন্দ নদী, জলাভূমি ও পানিসম্পদবিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের সঙ্গে যুক্ত
riverine.people@gmail.com