সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হৃদয়ে ছিল মানুষের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা। বাংলার দরিদ্র, শোষিত, অধিকারবঞ্চিত অসহায় মানুষগুলোকে শোষণ থেকে মুক্ত করতে হলে স্বাধীন দেশ গড়তে হবে। পরাধীন জাতি কখনও আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। স্বাধীনতা ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তিও আসে না। তাই তিনি সেই লক্ষ্য অর্জনকে সামনে রেখেই দেশ স্বাধীন করেছেন।
বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে তার প্রিয় মানুষের কাছে ফিরে আসেন। পরের দিন থেকেই রাষ্ট্রীয় কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। নয় মাস জেলে থাকায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল। তার বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিনি একটি দিনও বিশ্রাম নেননি।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। ধ্বংসাবেশ ছাড়া কিছুই নেই। যুদ্ধে রাস্তা, সড়ক, কালভার্ট, সেতু, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন তথা যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছিল। ব্যাংকে কোনো টাকা ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে দেশের পুনর্গঠন কাজে হাত দিতে হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হয়েছে। ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে তা চালু করতে হয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোকে দাঁড় করাতে হয়েছে। ভারত থেকে এক কোটি শরণার্থী প্রত্যাগমন করলে তাদের বাসস্থান ও খাবার সরবরাহ করতে হয়েছে। পঙ্গু ও আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। বিদেশ থেকে ঋণ, সাহায্য ও খাদ্য এনে মানুষকে খাওয়ায়ে বাঁচাতে হয়েছে।
নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে বঙ্গবন্ধু বেশি সময় নেননি। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নানারকম অপপ্রচার ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশ একের পর এক বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৭১ সালে দুটি, ১৯৭২ সালে ৮৮টি, ১৯৭৩ সালে ১৮টি এবং ১৯৭৪ সালে সাতটি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মোট কথা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত চীন, সৌদি আরব, সুদান, ওমান ও ব্রুনাই ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সকল দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। চীনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন। প্রায় সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যও হয়েছিল বাংলাদেশ। এটা সম্ভব হয়েছিল বিশ্ব অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর পরিচিতি, তার নেতৃত্ব ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকার কারণে।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে পরিকল্পিতভাবে জনসম্পদে রূপান্তর করে দেশকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। এমন কোনো সেক্টর ছিল না, যেখানে বঙ্গবন্ধু উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তিনি রাঙামাটির বেতবুনিয়াতে ভূ-উপগ্রহ স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু সমুদ্র তলদেশে প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজে জরিপ করার জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানান। ছয়টি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তিনি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমানার বিষয়টি ফয়সালার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি সমুদ্র-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে 'দ্য টেরিটরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট, ১৯৭৪' প্রণয়ন করেন। এই আইন বাংলাদেশের সমুদ্র জয়ের সোপান ছিল।
বঙ্গবন্ধু মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন। এ সুযোগ ব্যবহার করে স্বাধীনতাবিরোধী ও স্বার্থান্বেষী মহল বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে নানা রকম মিথ্যা, বানোয়াট, কাল্পনিক, অতিরঞ্জিত, পরিকল্পিত গুজব ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের সক্রিয় প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা সফলও হয়েছিল।
পুলিশ সর্বহারা পার্টি, গণবাহিনী ও দুস্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখলেও পুলিশের স্বল্পতা এবং সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা ছিল। এমতাবস্থায় রক্ষীবাহিনী অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালানি ও মজুদদারদের গ্রেপ্তার করে অবস্থার অনেকটা উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়। প্রথমদিকে রক্ষীবাহিনী বাড়াবাড়িও করেছিল। তাদের দ্বারা অনেকে নিগৃহীত হয়েছিল। কিন্তু তাদের পাল্লায় সফলতাই বেশি ছিল। রক্ষীবাহিনী আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক উন্নতি করেছিল। চোরাচালান ও মজুদদারি কমেছিল। পরবর্তী সময়ে রক্ষীবাহিনীর শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য কঠোর বিধিও প্রণীত হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু দেখলেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী মহল এবং বিদেশি প্রভুদের ষড়যন্ত্রে পা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু বিপথগামী তরুণ নেতা দেশের মধ্যে অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা সৃষ্টি করছে। তিনি ভাবলেন এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে জনস্বার্থে তাকে সাময়িকভাবে কিছু কঠোরতা আরোপ করতে হবে। তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে ফিরে গেলেন এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করলেন। মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনলেন।
বাকশাল ছিল একটি জাতীয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। বঙ্গবন্ধু সকল রাজনৈতিক দল ও সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিবর্গকে এই প্ল্যাটফর্মে আসার আহ্বান করলেন। বঙ্গবন্ধু মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন গোটা জাতি এক হয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূর করে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেনও এ ব্যবস্থা সাময়িককালের জন্য।
বাকশালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিলেন। দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রধান লক্ষ্য ছিল ক্ষেত-খামার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বৃদ্ধি করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং প্রশাসন ও বিচার বিভাগে সংস্কার আনা। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করার। থানা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পার্লামেন্ট জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবে। গ্রাম পরিষদে সকল শ্রেণি ও পেশার লোক থাকবে। প্রতি জেলায় একজন গভর্নর থাকবেন। তিনি জেলার প্রধান নির্বাহী হবেন। জেলার সার্বিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তার তত্ত্বাবধানে থাকবে।
কৃষি বিপ্লবের জন্য আধুনিক কৃষি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে সমবায় ভিত্তিতে চাষাবাদ করে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগে সংস্কার এনে প্রশাসনকে গণমুখী ও সেবামুখী এবং বিচারিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে চেয়েছিলেন।
দলমত নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব বাস্তবায়নের জন্য কাজ করলে আমার বিশ্বাস দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে চলে যেত। জাসদ ও সর্বহারা পার্টির নেতারা যদি দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি না করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করতেন তা হলে দেশের চেহারা ফিরে যেত। কিন্তু দেশি-বিদেশি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে পড়ে তারা ভুল পথে চলেছিলেন।
জাসদের রাজনীতি যে ভুল ছিল তা জাসদের প্রধান মেজর (অব.) জলিল নিজেই জনগণের কাছে স্বীকার করে জাসদ থেকে ১৯৮৪ সালের অক্টোবর মাসে পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি জাতীয় মুক্তি আন্দোলন নামে নতুন দল প্রতিষ্ঠা করে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের জন্ম দেন। যাদের ভুলের জন্য বহু লোকের জীবনাবসান হলো, দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হলো, দেশের ক্ষতি হলো- তার দায়দায়িত্ব কি জাসদ নেতৃবৃন্দ নেবেন না? অবশ্যই তাদের দায় আছে।
দেশের যে অরাজক পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি মহলের মদদে বেইমান মোশতাক নেপথ্যে জিয়ার সমর্থন নিয়ে বিপথগামী কতিপয় সেনা কর্মকর্তা দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলার ইতিহাসে যে কলঙ্কময় অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল, সেই অরাজকতার দায় থেকে কি জাসদ ও সর্বহারা পার্টির নেতারা অব্যাহতি পেতে পারেন? বিশিষ্টজন অনেকেই মনে করেন তারা এ দায় এড়াতে পারেন না।
সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল
বাংলাদেশ পুলিশ