বিকল্প নেতৃত্ব খোঁজা ও নানা সাংগঠনিক সমস্যা তুলে ধরে সোনিয়া গান্ধীকে দেওয়া ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের ২৩ জন শীর্ষস্থানীয় নেতার চিঠি সংস্কারের দিক থেকে ইতিবাচক হিসেবেই আমরা দেখি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, চিঠিতে স্বাক্ষরদাতা যারা কংগ্রেসে 'সার্বক্ষণিক ও কার্যকর নেতৃত্ব' ও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির (সিডব্লিউসি) স্বচ্ছ নির্বাচন দাবি করেছেন তারাও দলের ব্যর্থ শীর্ষ নেতৃত্বের অংশ। দৃশ্যত, চিঠির জবাবে সোনিয়া গান্ধী ওয়ার্কিং কমিটিকে নতুন সভাপতি খোঁজার কথা বলেছেন। এটা দেখার বাকি যে, তারা আগের মতোই চিন্তাভাবনা ছাড়াই রাহুল গান্ধীকে ফের নির্বাচিত করেন কিনা। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীসহ কংগ্রেসের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতা এরই মধ্যে দলের এ অবস্থায় গান্ধী পরিবারের সমর্থনে নেমে পড়েছেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বর্তমান অনেক সদস্য ও অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা এটা অনুধাবন করছেন, দলের নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন ঘটলে তারা তাদের পদবি হারাতে পারেন। যারা সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি দিয়েছেন, এটিই তাদের অনেকের আশঙ্কা। তারা রাশিয়ার অভ্যুত্থানের আগে মেনশেকিদের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। কিন্তু কংগ্রেসের এখন প্রয়োজন বলশেভক ধারার অনুসরণ। যেখানে ক্যাডার পদ্ধতিতে পুরো দলের কাঠামো হওয়া উচিত আদর্শভিত্তিক। একই সঙ্গে দলের নেতৃস্থান থেকে অকেজো লোকদের বাদ দিতে হবে।

দলকে নতুন ছাঁচে গড়ে পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিশীল এমন কোনো বিকল্প নেতৃত্ব কংগ্রেসে দেখা যাচ্ছে না। বলশেভিকের কথা বাদ দিলেও এমন কোনো লক্ষণ কংগ্রেসে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি কংগ্রেসের অপেক্ষাকৃত তরুণ তুর্কিদের মধ্যেও না। যে তরুণ অংশকে আমরা ১৯৬৭ সালের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে জেগে উঠতে দেখেছি। ওই বছর কংগ্রেস লোকসভার নির্বাচনে ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এর আগের তিনটি নির্বাচনের তুলনায় কংগ্রেস তখন তাৎপর্যপূর্ণভাবে কম ভোট পায়। অথচ কংগ্রেস এখন লোকসভায় ১০ শতাংশেরও কম আসনের অধিকারী। ২০১৯ সালের নির্বাচনে এ রকম ভরাডুবির পরও কেউই নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করেনি। বরং কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যরা রাহুল গান্ধীকে দলের সভাপতি রাখার চেষ্টায় পরস্পর প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। রাহুল যখন তা প্রত্যাখ্যান করে তখন তার মা সোনিয়া গান্ধীকে অনুরোধ করে। অর্থাৎ যে করেই হোক, তারা রাহুল গান্ধীকেই সভাপতি হিসেবে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

এখন দলের সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব ও সংস্কারের জন্য কিছু জ্যেষ্ঠ কংগ্রেস নেতার দাবি এটা বোঝাচ্ছে যে, দল এখন যে প্রধান সমস্যা মোকাবিলা করছে এর সমাধানে তারা জেগে উঠেছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, তারা এখনও বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ইচ্ছুক নন। তারা যে সমস্যা চিহ্নিত করেছেন তা কেবল উপসর্গ মাত্র। বরং দলের ধ্বংসের মূল কারণ, যার সূচনা হয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে; যেখানে দলের প্রায় সব ক্ষমতা তার পরিবারের হাতে কুক্ষিগত। আমি মনে করি, কংগ্রেসের ধ্বংসের দুটি মূল কারণের এটিই প্রথম কারণ। দলের মধ্যে চাটুকারিতার মনোভাব এবং নেতৃত্বে গান্ধী পরিবার থেকে বংশপরম্পরায় একজনের পর একজনের আগমনের কুপ্রথা দলের চিন্তা চেতনায় এটা প্রবেশ করেছে যে, যতই সংস্কারের চিঠি দেওয়া হোক না কেন- এটাই স্ব্বতঃসিদ্ধ। প্রতিবেদন বলছে, ২৩ নেতা যারা চিঠি লিখেছেন, তারা এটা স্পষ্ট করেছে যে, দলের সামগ্রিক নেতৃত্বে গান্ধী পরিবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই থাকবে। তাদের দৌড় আসলে এ পর্যন্তই এবং এর মাধ্যমেই বংশপরম্পরার পথ প্রশস্ত হচ্ছে। কংগ্রেসের অধঃপতনের দ্বিতীয় কারণ আদর্শগত। ভারতীয় গণতন্ত্রে বহুত্ববাদের সংস্কৃৃতিকে তুলে ধরতে কংগ্রেস ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের একজাতের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ না করার মাধ্যমে কংগ্রেস যেন বিজেপির বি টিমে রূপান্তরিত হয়েছে। শেষ দুই নির্বাচনে দেখা গেছে, ভারতীয় নির্বাচকমণ্ডলীর যে ভূমিকা পালন করার কথা সেখানেও তারা বিজ্ঞতার পরিচয় দেয়নি। কংগ্রেসের উচিত আদর্শগতভাবে তারা যে স্বাধীন মত প্রকাশ ও সবার অধিকার নিশ্চিতের পক্ষে সে অবস্থান তাদের ঠিক রাখা। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্যে তা এখনও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। অথচ সেটাই এখন জরুরি।

ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ইমেরিটাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র; দ্য হিন্দু থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

বিষয় : মোহাম্মদ আইউব

মন্তব্য করুন